দ্বিতীয় অধ্যায়: সাংখ্যযোগ

শ্লোক ও বিস্তারিত বিশ্লেষণ

শ্লোক ১

সঞ্জয় উবাচ —
তং তথা কৃপয়াবিষ্টমশ্রুপূর্ণাকুলেক্ষণম্ ।
বিষীদন্তমিদং বাক্যমুবাচ মধুসূদনঃ ॥ ১ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি (অনুষ্টুপ ছন্দ)

শ্লোকটি ৮টি অক্ষরে গঠিত ৪টি চরণে ভাগ করে পাঠ করা হয়:

  • তং তথা কৃপয়াবিষ্টম্ (১ম চরণ)
  • অশ্রুপূর্ণাকুলেক্ষণম্ (২য় চরণ)
  • বিষীদন্তমিদং বাক্যম্ (৩য় চরণ)
  • উবাচ মধুসূদনঃ (৪র্থ চরণ)

উচ্চারণ নিয়ম: 'অশ্রু' (শ্রু), 'পূর্ণা' (র্ণ), 'ক্ষণম্' (ক্ষ) যুক্তবর্ণগুলোর শুদ্ধ উচ্চারণ করতে হবে এবং শেষে বিসর্গ (ঃ) হালকা শ্বাস ছেড়ে উচ্চারণ করে সমাপ্ত করতে হবে।

২. শব্দার্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: সঞ্জয়ঃ উবাচ = সঞ্জয় বললেন; তম্ = অর্জুনকে; তথা = সেভাবে; কৃপয়া = ব্যাকুলতায়/দয়ায়; আবিষ্টম্ = আচ্ছন্ন/অভিভূত; অশ্রু-পূর্ণ-আকুল-ঈক্ষণম্ = সাশ্রুনয়ন ও আকুল চোখবিশিষ্ট; বিষীদন্তম্ = বিষাদগ্রস্ত অবস্থায়; ইদম্ বাক্যম্ = এই কথা; উবাচ = বললেন; মধুসূদনঃ = মধুসূদন (শ্রীকৃষ্ণ)।

বঙ্গানুবাদ: সঞ্জয় বললেন — "এভাবে করুণায় অভিভূত, অশ্রুপূর্ণ ব্যাকুল নয়নবিশিষ্ট এবং বিষণ্ণ অর্জুনকে মধুসূদন শ্রীকৃষ্ণ এই কথা বললেন।"

৩. শ্লোকের প্রধান অন্তর্নিহিত অর্থ

  • মনস্তাত্ত্বিক মোহ ও বিষাদ: অর্জুনের চোখের জল ও মনস্তাপ কেবল সাধারণ আবেগ নয়, তা মানুষের সংসারবদ্ধ মোহগ্রস্ততা ও কর্তব্যবিমূঢ়তার প্রতীক।
  • লৌকিক কৃপা ও মোহ: অর্জুন যাকে স্বজনের প্রতি 'কৃপা' বা দয়া ভাবছিলেন, তা আসলে কর্তব্যে অবহেলাজনিত মানসিক দুর্বলতা।
  • 'মধুসূদন' সম্বোধনের তাৎপর্য: শ্রীকৃষ্ণ যেমন 'মধু' অসুরকে বধ করেছিলেন, তেমনই তিনি অর্জুনের হৃদয়স্থিত মোহ ও অজ্ঞানতারূপ অসুরকে বিনাশ করতে আত্মজ্ঞানের মহতী বাণী প্রদান করতে যাচ্ছেন।

শ্লোক ২

শ্রীভগবানুবাচ —
কুতস্ত্বা কশ্মলমিদং বিষমে সমুপস্থিতম্ ।
অনার্যজুষ্টমস্বর্গ্যমকীর্তিকরমর্জুন ॥ ২ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • কুতঃ — ত্বা — কশ্মলম্ — ইদম্ — বিষমে — সমুপস্থিতম্ (১ম ও ২য় চরণ)
  • অনার্য-জুষ্টম্ — অস্বর্গ্যম্ — অকীর্তি-করম্ — অর্জুন (৩য় ও ৪র্থ চরণ)

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'কশ্মলম্' (শ+ম), 'সমুপস্থিতম্' (স+থ) এবং 'অস্বর্গ্যম্' যুক্তবর্ণগুলো স্পষ্ট করে উচ্চারণ করতে হবে এবং প্রতিটি চরণের শেষের অনুস্বার স্পষ্টভাবে বজায় রাখা প্রয়োজন।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: শ্রীভগবান্ উবাচ = শ্রীভগবান বললেন; কুতঃ = কোথা থেকে / কি হেতু; ত্বা = তোমাতে / তোমার মধ্যে; কশ্মলম্ = এই মোহ / হৃদয়ের পঙ্কিলতা বা অজ্ঞতা; ইদম্ = এই; বিষমে = এই বিষম সংগ্রাম-সংকটে / সংকটকালে; সমুপস্থিতম্ = উপস্থিত হলো / দেখা দিল; অনার্যজুষ্টম্ = আর্য বা প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিদের অযোগ্য; অস্বর্গ্যম্ = স্বর্গলাভের প্রতিবন্ধক / অধর্মকর; অকীর্তিকরম্ = অপযশকর / অখ্যাতিজনক; অর্জুন = হে অর্জুন!

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "হে অর্জুন! এই ঘোর সংকটময় যুদ্ধস্থলে কি জন্য তোমার মধ্যে অনার্যদের আচরণীয়, স্বর্গলাভের প্রতিবন্ধক এবং অপযশকর এই মোহের আবির্ভাব হলো?"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • ভগবানের প্রথম শ্রীমুখের বাণী: গীতায় এই প্রথম শ্লোক পর্যন্ত সঞ্জয় ও অর্জুনের কথা থাকলেও, দ্বিতীয় শ্লোক থেকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং মুখ খোলেন।
  • 'কশ্মলম্' (হৃদয়ের পঙ্কিলতা): অর্জুনের শোক ও ক্রন্দনকে শ্রীকৃষ্ণ সাধারণ আবেগ বা দয়া হিসেবে না দেখে 'কশ্মলম' বা হৃদয়ের মোহজাত ময়লা হিসেবে অভিহিত করেছেন।
  • 'অনার্যজুষ্টম': 'আর্য' শব্দের অর্থ যিনি স্বধর্মে স্থিত ও প্রজ্ঞাবান। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অর্জুনের পিছিয়ে যাওয়ার চিন্তা কোনো মহৎ গুণ নয়, বরং বিবেকহীন অনার্যের মতো আচরণ।
  • ইহলোক ও পরলোকের ক্ষতি: স্বধর্ম ত্যাগ করা ইহলোকে অখ্যাতি বয়ে আনে ('অকীর্তিকরম') এবং পরলোকেও গতি রুদ্ধ করে ('অস্বর্গ্যম')। এই শ্লোকের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে তাঁর ক্ষত্রিয় কর্তব্য ও আত্মমর্যাদা স্মরণ করিয়ে দেন।

শ্লোক ৩

ক্লৈব্যং মা স্ম গমঃ পার্থ নৈতত্ত্বয্যুপপদ্যতে ।
ক্ষুদ্রং হৃদয়দৌর্বল্যং ত্যক্ত্বোত্তিষ্ঠ পরন্তপ ॥ ৩ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: ক্লৈব্যম্ — মা — স্ম — গমঃ — পার্থ
  • দ্বিতীয় চরণ: ন — এতৎ — ত্বয়ি — উপপদ্যতে
  • তৃতীয় চরণ: ক্ষুদ্রম্ — হৃদয়-দৌর্বল্যম্
  • চতুর্থ চরণ: ত্যক্ত্বা — উত্তিষ্ঠ — পরন্তপ

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'ক্লৈব্যম্' (ক্লৈ+ব্+যম্) এবং 'নৈতত্ত্বয্যুপপদ্যতে' (ন+এতৎ+ত্বয়ি+উপপদ্যতে) পদগুলো ভেঙে উচ্চারণ করলে পাঠ সহজ ও শুদ্ধ হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: ক্লৈব্যম্ = ক্লীব ভাব বা কাপুরুষতা; মা স্ম গমঃ = প্রাপ্ত হইও না / বশীভূত হইও না; পার্থ = হে অর্জুন (পৃথাপুত্র)!; ন = না; এতৎ = এই আচরণ / কাতরতা; ত্বয়ি = তোমাতে / তোমার মধ্যে; উপপদ্যতে = শোভা পায় / উপযুক্ত হয়; ক্ষুদ্রম্ = তুচ্ছ / নিকৃষ্ট; হৃদয়দৌর্বল্যম্ = হৃদয়ের দুর্বলতা; ত্যক্ত্বা = ত্যাগ করিয়া; উত্তিষ্ঠ = উঠে দাঁড়াও / যুদ্ধার্থ উত্থিত হও; পরন্তপ = হে শত্রুতাপন অর্জুন!

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "হে পার্থ! এই অনার্যোচিত কাতরতা বা ক্লীবত্বের বশবর্তী হইও না; এ আচরণ তোমাতে শোভা পায় না। হে পরন্তপ! হৃদয়ের এই তুচ্ছ দুর্বলতা পরিত্যাগ করে যুদ্ধের জন্য উঠে দাঁড়াও।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • কৃপা নয়, দুর্বলতা: ১ম শ্লোকে অর্জুন যাকে করুণা বা দয়া ভেবেছিলেন, শ্রীকৃষ্ণ এই ৩ নম্বর শ্লোকে তাকে সোজাসুজি 'হৃদয়দৌর্বল্য' বা মানসিক দুর্বলতা বলে চিহ্নিত করেছেন।
  • 'পার্থ' ও 'পরন্তপ' সম্বোধনের রহস্য: শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে 'পার্থ' (বীরমাতা পৃথা বা কুন্তীর পুত্র) এবং 'পরন্তপ' (যিনি শত্রুকে উত্তপ্ত বা পরাভূত করেন) বলে ডেকে তাঁর বীরোচিত ঐতিহ্য ও শত্রুদমনের সামর্থ্য স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
  • ক্লীবত্ব ত্যাগ করার ডাক: স্বধর্ম ও ন্যায়যুদ্ধের ক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়া বীর ক্ষত্রিয় অর্জুনের জন্য চরম অপমানজনক।
  • মানবজীবনের জাগ্রত বাণী: এই শ্লোকটি কেবল অর্জুনের জন্য নয়, জীবনের ঘোর সংকটকালে মোহ ও বিষাদে ভেঙে পড়া প্রতিটি মানুষের প্রতি শ্রীকৃষ্ণের এক পরম জাগরণী আহ্বান — "ক্ষুদ্র মানসিক দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলে নিজ কর্তব্যে উঠে দাঁড়াও"।

শ্লোক ৪

অর্জুন উবাচ —
কথং ভীষ্মমহং সংখ্যে দ্রোণং চ মধুসূদন ।
ইষুভিঃ প্রতিযোৎস্যামি পূজার্হাবরিসূদন ॥ ৪ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: কথম্ — ভীষ্মম্ — অহম্ — সংখ্যে
  • দ্বিতীয় চরণ: দ্রোণম্ — চ — মধুসূদন
  • তৃতীয় চরণ: ইষুভিঃ — প্রতিযোৎস্যামি
  • চতুর্থ চরণ: পূজার্হৌ — অরি-সূদন

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'ভীষ্মমহং' (ভীষ্মম্ + অহম্) এবং 'পূজার্হাবরিসূদন' (পূজার্হৌ + অরিসূদন) পদগুলোর সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দে ধীরগতিতে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: অর্জুনঃ উবাচ = অর্জুন বললেন; কথম্ = কীভাবে / কী প্রকারে; ভীষ্মম্নামপদ = পিতামহ ভীষ্মকে; অহম্ = আমি; সংখ্যে = যুদ্ধক্ষেত্রে / যুদ্ধে; দ্রোণম্নামপদ = আচার্য দ্রোণকে; চ = এবং; মধুসূদন = হে মধুসূদন!; ইষুভিঃ = বাণ বা শরসমূহের দ্বারা; প্রতিযোৎস্যামি = প্রতিযুদ্ধ বা উল্টো আক্রমণ করব; পূজার্হৌ = পরম পূজনীয় দুজনকে; অরিসূদন = হে শত্রুনাশক!

বঙ্গানুবাদ: অর্জুন বললেন — "হে অরিসূদন মধুসূদন! যে পিতামহ ভীষ্ম ও গুরু দ্রোণাচার্য সর্বতোভাবে আমার পূজনীয়, যুদ্ধে আমি কী প্রকারে তাঁদের ওপর বাণ বর্ষণ করে প্রতিযুদ্ধ করব?"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • ভগবানের বাক্যের প্রত্যুত্তর: ৩ নম্বর শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের বিষাদকে 'ক্লীবত্ব' ও 'হৃদয়দৌর্বল্য' বলে কটাক্ষ করেছিলেন। এই ৪ নম্বর শ্লোকে অর্জুন বিনীতভাবে বোঝাতে চান যে, তাঁর এই দ্বিধা কাপুরুষতা নয়, বরং গুরুজনদের প্রতি প্রগাঢ় শ্রদ্ধা ও ধর্মনীতির প্রশ্ন।
  • পাদপদ্মে পুষ্প অর্পণ নাকি বাণ বর্ষণ?: সনাতন ধর্মে গুরু ও পিতামহ পরম পূজনীয়। অর্জুনের আকুলতা হলো — যাঁর চরণে প্রতিদিন ফুল দিয়ে প্রণাম করা উচিত, ধনুর্বিদ্যা শেখানো সেই শিক্ষাগুরুর বুকে কীভাবে অস্ত্র প্রয়োগ করা সম্ভব?
  • 'অরিসূদন' সম্বোধনের রহস্য: অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে 'অরিসূদন' (যিনি অরি বা শত্রুকে সংহার করেন) বলে ডেকে ইঙ্গিত করেন যে, শ্রীকৃষ্ণ অশুভ শত্রুকে বধ করেন; কিন্তু ভীষ্ম ও দ্রোণ তো অর্জুনের শত্রু নন, তবে কীভাবে তাঁদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা যায়?

শ্লোক ৫

গুরূনহত্বা হি মহানুভাবান্ শ্রেয়ো ভোক্তুং ভৈক্ষ্যমপীহ লোকে ।
হত্বার্থকামাংস্তু গুরূনিহৈব ভুঞ্জীয় ভোগান্রুধিরপ্রদিগ্ধান্ ॥ ৫ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (ত্রিষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: গুরূন্ — অহত্বা — হি — মহানুভাবান্
  • দ্বিতীয় চরণ: শ্রেয়ঃ — ভোক্তুম্ — ভৈক্ষ্যম্ — অপি — ইহ — লোকে
  • তৃতীয় চরণ: হত্বা — অর্থ-কামান্ — তু — গুরূন্ — ইহ — এব
  • চতুর্থ চরণ: ভুঞ্জীয় — ভোগান্ — রুধির-প্রদিগ্ধান্

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'গুরূনহত্বা' (গুরূন্ + অহত্বা), 'ভৈক্ষ্যমপীহ' (ভৈক্ষ্যম্ + অপি + ইহ) এবং 'রুধিরপ্রদিগ্ধান্' (রুধির + প্রদিগ্ধান্) পদগুলোর সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ নয়, বরং ১১ অক্ষরের 'ত্রিষ্টুপ' ছন্দে গম্ভীর স্বরে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: মহানুভাবান্ = মহানুভাব গুরুজনদের; গুরূন্ = গুরুবর্গকে; অহত্বা = হত্যা বা বধ না করে; হি = নিশ্চয়ই / কারণ; ইহা লোকে = এই মর্ত্যলোকে / এই জগতে; ভৈক্ষ্যম্ = ভিক্ষালব্ধ অন্ন; অপি = -ও; ভোক্তুম্ = ভক্ষণ করা; শ্রেয়ঃ = অধিক কল্যাণকর / মঙ্গলজনক; তু = কিন্তু; অর্থকামান্ = অর্থ ও কামনাসম্পন্ন; হত্বা = হত্যা করে; ভুঞ্জীয় = ভোগ করতে হবে; ভোগান্ = ভোগ্য বস্তুসমূহ; রুধিরপ্রদিগ্ধান্ = রক্তলিপ্ত / শোণিতলিপ্ত

বঙ্গানুবাদ: অর্জুন বললেন — "মহানুভাব গুরুজনদের হত্যা না করে এই জগতে ভিক্ষালব্ধ অন্ন ভক্ষণ করাও অধিক কল্যাণকর। কিন্তু অর্থ ও কামনাসম্পন্ন গুরুবর্গকে বধ করলে এই জগতেই তাঁদের রক্তে রঞ্জিত অর্থ ও কামাদি ভোগসমূহ আমাকে ভোগ করতে হবে।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • ভিক্ষান্ন বনাম রাজভোগ: অর্জুনের মতে ক্ষত্রিয় ধর্মে রাজ্যলাভের গুরুত্ব থাকলেও, গুরুজনদের রক্তে রঞ্জিত রাজ্য ভোগ করার চেয়ে রাজকীয় সম্মান ত্যাগ করে ভিক্ষাজীবী হওয়াও বহুগুণে শ্রেয়।
  • 'মহানুভাবান্' পদের গুরুত্ব: ভীষ্ম ও দ্রোণ কেবল সাধারণ শত্রু নন; তাঁরা শাস্ত্র ও অস্ত্রবিদ্যা দানকারী মহানুভাব গুরুজন। অর্জুনের বিবেক কোনোভাবেই এই মহৎ ব্যক্তিত্বদের ওপর শরাঘাত সমর্থন করছে না।
  • 'অর্থকামান্' পদের সূক্ষ্ম ইঙ্গিত: গুরুজনরা দুর্যোধনের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন অর্থ ও জাগতিক সম্মানের টানে। অর্জুন মনে করছেন, তাঁরা বিভ্রান্ত হলেও শিষ্য হিসেবে তাঁদের হত্যা করে রক্তমাখা পরম সুখ ভোগ করা চরম আত্মগ্লানিকর।
  • আবেগ ও কর্তব্য সংকট: অর্জুন পার্থিব বিজয় ও রাজভোগের চেয়ে নৈতিক পবিত্রতাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন, যা তাঁর গভীর মানসিক দ্বিধার বহিঃপ্রকাশ।

শ্লোক ৬

ন চৈতদ্বিদ্মঃ কতরন্নো গরীয়ো যদ্বা জয়েম যদি বা নো জয়েয়ুঃ ।
যানেব হত্বা ন জিজীবিষামস্তেঽবস্থিতাঃ প্রমুখে ধার্তরাষ্ট্রাঃ ॥ ৬ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (ত্রিষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: ন — চ — এতৎ — বিদ্মঃ
  • দ্বিতীয় চরণ: কতরৎ — নঃ — গরীয়ঃ — যৎ — বা — জয়েম — যদি — বা — নঃ — জয়েয়ুঃ
  • তৃতীয় চরণ: য়ান্ — এব — হত্বা — ন — জিজীবিষামঃ
  • চতুর্থ চরণ: তে — অবস্থিতাঃ — প্রমুখে — ধার্তরাষ্ট্রাঃ

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: ন = না; চ = এবং; এতৎ = এই বিষয়টি; বিদ্মঃ = বুঝতে পারছি / জানি; কতরৎ = দুয়ের মধ্যে কোনটি; নঃ = আমাদের পক্ষে / আমাদের জন্য; গরীয়ঃ = অধিকতর শ্রেয় বা মঙ্গলজনক; যদ্বা = যদি বা; জয়েম = আমরা জয় লাভ করি; যদি বা = অথবা যদি; নো (নঃ) = আমাদেরকে; জয়েযুঃ = তাঁরা (কৌরবগণ) জয় করে; য়ান্ = যাঁদেরকে; এব = বাস্তবিকই; হত্বা = বধ বা হত্যা করে; ন = না; জিজীবিষামঃ = বেঁচে থাকার ইচ্ছা রাখি; তে = তাঁরাই; অবস্থিতাঃ = উপস্থিত রয়েছেন; প্রমুখে = যুদ্ধক্ষেত্রে আমাদের মুখোমুখি/সম্মুখে; ধার্তরাষ্ট্রাঃ = ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র ও তাঁর পক্ষের রাজন্যবর্গ

বঙ্গানুবাদ: অর্জুন বললেন — "আমরা জয়ী হই কিংবা তাঁরাই আমাদের জয় করুন — এই দুইয়ের মধ্যে কোনটি আমাদের পক্ষে অধিকতর শ্রেয়স্কর, তা আমরা বুঝতে পারছি না। কারণ যাঁদের বধ করে আমরা বেঁচে থাকার ইচ্ছাও রাখি না, সেই ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রেরা যুদ্ধক্ষেত্রে আমাদের সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • দ্বিধা ও সিদ্ধান্তহীনতা: অর্জুন এখানে দুই দিক দিয়েই নিজেকে পরাজিত মনে করছেন — যুদ্ধে জয়লাভ করলে স্বজনবধের মহাপাপ ও গ্লানি, আর পরাজিত হলে পরাজয়ের অপমান।
  • বিজয়ের নিরর্থকতা: অর্জুনের মতে, কৌরবদের হত্যা করে পৃথিবীর একচ্ছত্র রাজ্যলাভ হলেও সেই রক্তমাখা বিজয় উদযাপনের কোনো অর্থ হয় না, কারণ যাঁদের নিয়ে বেঁচে থাকার আনন্দ, তাঁরাই নিহত হবেন।
  • পরবর্তী শ্লোকে আত্মসমর্পণের পটভূমি: নিজের বুদ্ধি দিয়ে যখন অর্জুন ধর্মসংকটের কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছেন না, তখন তিনি বুঝতে পারেন যে কেবল পরমজ্ঞানী কোনো গুরুর শরণাপন্ন হওয়াই একমাত্র পথ। এই অনুভূতিই তাঁকে পরের ৭ নম্বর শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণের চরণে শিষ্যের মতো আত্মসমর্পণ করতে চালিত করে।

শ্লোক ৭

কার্পণ্যদোষোপহতস্বভাবঃ পৃচ্ছামি ত্বাং ধর্মসংমূঢচেতাঃ ।
যচ্ছ্রেয়ঃ স্যান্নিশ্চিতং ব্রূহি তন্মে শিষ্যস্তেঽহং শাধি মাং ত্বাং প্রপন্নম্ ॥ ৭ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (ত্রিষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: কার্পণ্য-দোষ-উপহত-স্বভাবঃ — পৃচ্ছামি — ত্বাম্ — ধর্ম-সংমূঢ-চেতাঃ
  • দ্বিতীয় চরণ: যৎ — শ্রেয়ঃ — স্যাৎ — নিশ্চিতম্ — ব্রূহি — তৎ — মে
  • তৃতীয় চরণ: শিষ্যঃ — তে — অহম্ — শাধি — মাম্ — ত্বাম্ — প্রপন্নম্

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'কার্পণ্যদোষোপহতস্বভাবঃ' (কার্পণ্য + দোষ + উপহত + স্বভাবঃ) এবং 'শিষ্যস্তেঽহং' (শিষ্যঃ + তে + অহম্) পদগুলো ভেঙে স্বচ্ছভাবে উচ্চারণ করা প্রয়োজন।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: কার্পণ্যদোষোপহতস্বভাবঃ = কৃপণতা বা দীনতাজনিত দোষ দ্বারা অভিভূত স্বভাব; পৃচ্ছামি = জিজ্ঞাসা করছি; ত্বাম্ = আপনাকে; ধর্মসংমূঢচেতাঃ = ধর্মাধর্ম ও কর্তব্য বিষয়ে বিভ্রান্ত বা সন্দিগ্ধ চিত্ত; যৎ = যা; শ্রেয়ঃ = পরম কল্যাণ বা মঙ্গলজনক; স্যাৎ = হতে পারে / হবে; নিশ্চিতম্ = সুনিশ্চিতরূপে; ব্রূহি = বলুন / প্রকাশ করুন; তৎ = তা; মে = আমার পক্ষে / আমাকে; শিষ্যঃ = শিষ্য; তে = আপনার; অহম্ = আমি; শাধি = উপদেশ ও শিক্ষা প্রদান করুন; মাম্ = আমাকে; ত্বাম্ প্রপন্নম্ = আপনার শরণাগত

বঙ্গানুবাদ: অর্জুন বললেন — "কৃপণতাজনিত দোষে আমার স্বাভাবিক বীরত্ব ও চরিত্র অভিভূত হয়েছে এবং কর্তব্য নির্ণয়ে আমার মন বিভ্রান্ত। তাই আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করছি—যা আমার পক্ষে সুনিশ্চিত মঙ্গলজনক (শ্রেয়ঃ), তা আমাকে বলুন। আমি আপনার শিষ্য এবং আপনার শরণাগত; আমাকে শিক্ষা দিন।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • গীতার মোড় পরিবর্তন (গুরুর শরণাগতি): এ শ্লোক পর্যন্ত শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের সম্পর্ক ছিল সখার বা বন্ধুর। কিন্তু অর্জুন বুঝতে পারেন যে কেবল কেবল সাধারণ বন্ধুত্বের পরামর্শ দিয়ে এই মহা-ধর্মসংকট থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব নয়। তাই তিনি নিজের অহংকার ত্যাগ করে শ্রীকৃষ্ণকে 'গুরু' বলে বরণ করে নেন।
  • 'কার্পণ্যদোষ' ও মোহ: নিজ কর্তব্য ও স্বধর্ম বিচ্যুত হওয়াকে অর্জুন 'কার্পণ্যদোষ' বা হৃদয়ের দীনতা বলেছেন। মোহের কারণে আত্মজ্ঞান ঢাকা পড়লে মানুষ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে।
  • 'প্রেয়' নয়, 'শ্রেয়': সাধারণ মানুষ চায় তাৎক্ষণিক সুখ বা 'প্রেয়'। কিন্তু অর্জুন কৃষ্ণের কাছে পার্থিব কোনো সুখ না চেয়ে যা চিরন্তন ও পরম কল্যাণকর ('শ্রেয়ঃ'), তা জানতে চেয়েছেন।
  • আত্মসমর্পণের পরম শর্ত: "শিষ্যস্তেঽহং শাধি মাং ত্বাং প্রপন্নম্" — গুরুর কাছে নিজেকে পূর্ণমাত্রায় সমর্পণ না করলে এবং শিষ্যের ভাব গ্রহণ না করলে পরমজ্ঞান লাভ করা যায় না, এটিই এই শ্লোকের মূল আধ্যাত্মিক বার্তা।

শ্লোক ৮

ন হি প্রপশ্যামি মমাপনুদ্যা-
দ্যচ্ছোকমুচ্ছোষণমিন্দ্রিয়াণাম্ ।
অবাপ্য ভূমাবসপত্নমৃদ্ধং-
রাজ্যং সুরাণামপি চাধিপত্যম্ ॥ ৮ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (ত্রিষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: ন — হি — প্রপশ্যামি — মম — অপনুদ্যাৎ
  • দ্বিতীয় চরণ: যৎ — শোকম্ — উচ্ছোষণম্ — ইন্দ্রিয়াণাম্
  • তৃতীয় চরণ: অবাপ্য — ভূমৌ — অসপত্নম্ — ঋদ্ধম্
  • চতুর্থ চরণ: রাজ্যম্ — সুরাণাম্ — অপি — চ — আধিপত্যম্

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'মমাপনুদ্যাদ্যচ্ছোকম্' (মম + অপনুদ্যাৎ + যৎ + শোকম্) এবং 'ভূমাবসপত্নমৃদ্ধম্' (ভূমৌ + অসপত্নম্ + ঋদ্ধম্) পদগুলোর সন্ধি ভেঙে ত্রিষ্টুপ ছন্দের নিয়মে ধীরগতিতে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: ন = না; হি = কারণ / নিশ্চয়ই; প্রপশ্যামি = দেখতে পাচ্ছি / দেখতে পাই; মম = আমার; অপনুদ্যাৎ = দূর করতে পারে / অপনোদন করবে; যৎ = যা / যে উপায়; শোকম্ = শোক বা বিষাদ; উচ্ছোষণম্ = অতিশয় শুষ্ককারী / শোষণকারী; ইন্দ্রিয়াণাম্ = ইন্দ্রিয়সমূহের; অবাপ্য = লাভ করে / প্রাপ্ত হলেও; ভূমৌ = পৃথিবীতে; অসপত্নম্ = শত্রুনিষ্কণ্টক / শত্রুহীন; ঋদ্ধম্ = সমৃদ্ধিশালী / ধনধান্যপূর্ণ; রাজ্যম্ = রাজ্য; সুরাণাম্ = দেবগণের / দেবতাদের; অপি = -ও / এমনকি; চ = এবং; আধিপত্যম্ = একচ্ছত্র আধিপত্য বা প্রভুত্ব

বঙ্গানুবাদ: অর্জুন বললেন — "পৃথিবীতে নিষ্কণ্টক, সমৃদ্ধিশালী রাজ্য এবং এমনকি দেবলোকের আধিপত্য লাভ করলেও, যা আমার ইন্দ্রিয়গুলোকে শুষ্ককারী এই গভীর শোক দূর করতে পারে — এমন কোনো উপায় আমি দেখতে পাচ্ছি না।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • জাগতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা: অর্জুন স্পষ্ট বুঝতে পেরেছেন যে পৃথিবীর নিষ্কণ্টক একচ্ছত্র রাজ্য বা স্বর্গের দেবরাজত্ব পেলেও মন ও আত্মার গভীর ক্ষত বা শোক দূর হয় না। পার্থিব ভোগসম্পদ কেবল বহিরাঙ্গের তৃপ্তি দিতে পারে, কিন্তু ভেতরের মোহাচ্ছন্নতা কাটাতে পারে না।
  • ব্রহ্মবিদ্যার প্রয়োজনীয়তা: আগের শ্লোকে (৭ম শ্লোক) শ্রীকৃষ্ণের কাছে শিষ্যের মতো শরণাগত হওয়ার পর এই শ্লোকে অর্জুন স্বীকার করলেন যে, পরম আত্মজ্ঞান ছাড়া এই হৃদয়বিদারক শোক থেকে মুক্ত হওয়ার আর কোনো উপায় নেই।
  • অর্জুনের বক্তব্যের সমাপ্তি: মহাভারতের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে এটিই ছিল অর্জুনের নিজস্ব দ্বিধা ও ব্যাকুলতার শেষ উক্তি। এর পরের ৯ নম্বর শ্লোকে অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে "ন যোৎস্যে" (আমি যুদ্ধ করব না) বলে সম্পূর্ণ নীরব হয়ে যান।

শ্লোক ৯

সঞ্জয় উবাচ —
এবমুক্ত্বা হৃষীকেশং গুডাকেশঃ পরন্তপঃ ।
ন যোৎস্য ইতি গোবিন্দমুক্ত্বা তূষ্ণীং বভূব হ ॥ ৯ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: এবম্ — উক্ত্বা — হৃষীকেশম্ — গুডাকেশঃ — পরন্তপঃ
  • দ্বিতীয় চরণ: ন — যোৎস্যে — ইতি — গোবিন্দম্ — উক্ত্বা — তূষ্ণীম্ — বভূব — হ

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: সঞ্জয়ঃ উবাচ = সঞ্জয় বললেন; পরন্তপঃ = শত্রুতাপন; গুডাকেশঃ = জিতনিদ্র অর্জুন; হৃষীকেশম্ = ইন্দ্রিয়াধিপতি শ্রীকৃষ্ণকে; এবম্ উক্ত্বা = সেকথা বা এরূপ বলে; ন যোৎস্যে = আমি যুদ্ধ করব না; ইতি = ইহা; গোবিন্দম্ = গোবিন্দকে; উক্ত্বা = বলে; তূষ্ণীম্ = মৌনী / নীরব; বভূব হ = হয়ে রইলেন

বঙ্গানুবাদ: সঞ্জয় বললেন — "ইন্দ্রিয়াধিপতি শ্রীকৃষ্ণকে এই কথা বলার পর, জিতনিদ্র শত্রুতাপন অর্জুন গোবিন্দকে 'আমি যুদ্ধ করব না' বলে নীরব হয়ে রইলেন।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • অর্জুনের চরম সিদ্ধান্ত ও নীরবতা: আগের শ্লোকগুলোতে অর্জুন তাঁর সমস্ত সংশয় প্রকাশ করার পর, শেষ কথা জানিয়ে দেন যে তিনি যুদ্ধ করবেন না এবং এরপর সম্পূর্ণ নীরব হয়ে যান।
  • 'গুডাকেশ' ও 'হৃষীকেশ' পদের ইঙ্গিত: 'গুডাকেশ' অর্থাৎ যিনি নিদ্রা ও আলস্য জয় করেছেন সেই বীর অর্জুনও মোহের বশীভূত হয়েছেন। অন্যদিকে শ্রীকৃষ্ণ হলেন 'হৃষীকেশ' (ইন্দ্রিয়ের অধিপতি), যিনি অর্জুনের বিভ্রান্ত মন ও ইন্দ্রিয়কে সঠিক পথে পরিচালনা করতে সমর্থ।

শ্লোক ১০

তমুবাচ হৃষীকেশঃ প্রহসন্নিব ভারত ।
সেনয়োরুভয়োর্মধ্যে বিষীদন্তমিদং বচঃ ॥ ১০ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • তম্ — উবাচ — হৃষীকেশঃ — প্রহসন্ — ইব — ভারত
  • সেনয়োঃ — উভয়োঃ — মধ্যে — বিষীদন্তম্ — ইদম্ — বচঃ

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: ভারত = হে ভারত! (ধৃতরাষ্ট্র); হৃষীকেশঃ = শ্রীকৃষ্ণ; উভয়োঃ সেনয়োঃ মধ্যে = দুই পক্ষের সৈন্যবাহিনীর মাঝখানে; বিষীদন্তম্ = বিষাদগ্রস্ত; তম্ = সেই অর্জুনকে; প্রহসন্ ইব = যেন হাসতে হাসতে / প্রসন্ন বদনে; ইদম্ বচঃ = এই কথা; উবাচ = বললেন

বঙ্গানুবাদ: সঞ্জয় বললেন — "হে ভারত (ধৃতরাষ্ট্র)! অনন্তর শ্রীকৃষ্ণ দুই সেনাদলের মাঝখানে বিষাদগ্রস্ত অর্জুনকে যেন মৃদু হাসতে হাসতে (প্রসন্ন বদনে) এই কথা বললেন।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • 'প্রহসন্নিব' (মৃদু হাস্য): বিষাদগ্রস্ত অর্জুনের সামনে শ্রীকৃষ্ণের এই মৃদু হাসি নির্দেশ করে যে, অর্জুনের কাছে যা অতি কঠিন সংকট, শ্রীকৃষ্ণের দৃষ্টিতে তা কেবল মোহ ও অজ্ঞতার ফল, যা আত্মজ্ঞানের প্রভাবে সহজেই দূর হয়ে যাবে।
  • 'সেনয়োরুভয়োর্মধ্যে' (জীবনসংগ্রামের কেন্দ্রস্থল): গীতার এই অমর শিক্ষা কোনো নির্জন অরণ্যে নয়, বরং কুরুক্ষেত্রের রণদীপ্ত যুদ্ধের মাঝখানে দেওয়া হয়েছিল। এটি প্রকাশ করে যে, জাগতিক কর্ম ও সংঘাতের ভেতরে থেকেই পরম আত্মজ্ঞান অর্জন করতে হয়।

শ্লোক ১১

শ্রীভগবানুবাচ —
অশোচ্যানন্বশোচস্ত্বং প্রজ্ঞাবাদাংশ্চ ভাষসে ।
গতাসূনগতাসূংশ্চ নানুশোচন্তি পণ্ডিতাঃ ॥ ১১ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: অশোচ্যান্ — অন্বশোচঃ — ত্বম্
  • দ্বিতীয় চরণ: প্রজ্ঞাবাদান্ — চ — ভাষসে
  • তৃতীয় চরণ: গতাসূন্ — অগতাসূন্ — চ
  • চতুর্থ চরণ: ন — অনুশোচন্তি — পণ্ডিতাঃ

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'অশোচ্যানন্বশোচস্ত্বং' (অশোচ্যান্ + অন্বশোচঃ + ত্বম্) এবং 'গতাসূনগতাসূংশ্চ' (গতাসূন্ + অগতাসূন্ + চ) পদগুলো অনুষ্টুপ ছন্দে সন্ধি ভেঙে ধীরলয়ে উচ্চারণ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: শ্রীভগবান্ উবাচ = শ্রীভগবান বললেন; ত্বম্ = তুমি; অশোচ্যান্ = যাঁদের জন্য শোক করা অনুচিত; অন্বশোচঃ = শোক প্রকাশ করছ; প্রজ্ঞাবাদান্ = পণ্ডিতের ন্যায় বা প্রজ্ঞাপূর্ণ বাক্য; চ = এবং; ভাষসে = বলছ; গতাসূন্ = গতপ্রাণ বা মৃত ব্যক্তিদের জন্য; অগতাসূন্ = সপ্রাণ বা জীবিত ব্যক্তিদের জন্য; ন = না; অনুশোচন্তি = শোক বা অনুশোচনা করেন; পণ্ডিতাঃ = আত্মজ্ঞানী বা পণ্ডিতগণ

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "হে অর্জুন! তুমি যাঁদের জন্য শোক করা অনুচিত তাঁদের জন্য শোক করছ এবং পাণ্ডিত্যপূর্ণ বাক্য বলছ। কিন্তু প্রকৃত পণ্ডিতগণ মৃত বা জীবিত কারও জন্যই শোক করেন না।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • ভগবানের উপদেশের শুভ সূচনা: গীতার ১ম অধ্যায় এবং ২য় অধ্যায়ের ১ম থেকে ১০ম শ্লোক পর্যন্ত অর্জুনের ক্ষোভ, বিষাদ ও আকুলতা বর্ণিত হয়েছে। এই ১১ নম্বর শ্লোক থেকেই শ্রীকৃষ্ণ গুরুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে প্রথম জ্ঞান বাণী প্রদান শুরু করেন।
  • অর্জুনের মেকি পাণ্ডিত্য প্রকাশ: অর্জুন আগের শ্লোকগুলোতে অহিংসা ও গুরূহত্যার পাপ নিয়ে প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা বলছিলেন, অথচ তিনি কেবল ক্ষণস্থায়ী জড়দেহের বিচ্ছেদের ভয়ে ব্যাকুল ছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের এই দ্বিমুখী ভাবনাকে বাহ্যিক ও অজ্ঞতাপ্রসূত বলে চিহ্নিত করেন।
  • প্রকৃত 'পণ্ডিত' বা জ্ঞানীর লক্ষণ: গীতা অনুযায়ী যিনি আত্মা ও দেহের পার্থক্য জানেন, তিনিই প্রকৃত পণ্ডিত। জড়দেহের জন্ম বা বিনাশ অবিনাশী আত্মাকে স্পর্শ করে না; তাই আত্মজ্ঞানী ব্যক্তি জীবিত বা মৃত কোনো দেহের জন্য শোকে মোহাচ্ছন্ন হন না।

শ্লোক ১২

ন ত্বেবাহং জাতু নাসং ন ত্বং নেমে জনাধিপাঃ ।
ন চৈব ন ভবিষ্যামঃ সর্বে বয়মতঃ পরম্ ॥ ১২ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: ন — তু — এব — অহম্ — জাতু — ন — আসম্
  • দ্বিতীয় চরণ: ন — ত্বম্ — ন — ইমে — জনাধিপাঃ
  • তৃতীয় চরণ: ন — চ — এব — ন — ভবিষ্যামঃ
  • চতুর্থ চরণ: সর্বে — বয়ম্ — অতঃপরম্

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'ন ত্বেবাহং' (ন + তু + এব + অহম্) এবং 'নেমে' (ন + ইমে) পদগুলোর সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে স্পষ্ট লয়ে উচ্চারণ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: ন তু এব = ইহা কিন্তু নহে; অহম্ = আমি (শ্রীকৃষ্ণ); জাতু = কদাচিৎ / অতীতে কোনো সময়; ন আসম্ = ছিলাম না; ন ত্বম্ = তুমি (অর্জুন) যে ছিলে না তা নয়; ন ইমে = এই সকল রাজন্যবর্গ যে ছিলেন না তা নয়; জনাধিপাঃ = নৃপতিগণ / রাজাগণ; ন চ এব = এবং ইহাও নহে; ন ভবিষ্যামঃ = থাকব না বা অস্তিত্বহীন হব; সর্বে বয়ম্ = আমরা সকলে; অতঃ পরম্ = এর পরেও / ভবিষ্যতে

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "পূর্বে যে আমি কখনো ছিলাম না তা নয়, তুমি যে ছিলে না এমনও নয়, আর এই রাজন্যবর্গ যে ছিলেন না তাহাও নহে; অর্থাৎ আমরা যেমন এখন আছি, পূর্বেও সেরূপ ছিলাম এবং ভবিষ্যতেও আমরা সকলেই একইভাবে থাকব।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • আত্মার নিত্যতা ও শাশ্বত রূপ: এই শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ আত্মতত্ত্বের মূল সত্য প্রকাশ করে অর্জুনকে জানান যে, আত্মার কোনো বিনাশ নেই। স্থূলদেহের সৃষ্টি বা ধ্বংস হলেও আত্মা সর্বদা বিদ্যমান থাকে।
  • ত্রিকালদর্শী অস্তিত্ব: আত্মা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ — এই তিন কালেই সত্য ও সনাতন। বর্তমান দেহের পূর্বেও আমাদের অস্তিত্ব ছিল এবং মৃত্যুর পরেও আত্মার অস্তিত্ব অক্ষুণ্ণ থাকবে।
  • জীবাত্মা ও পরমাত্মার নিত্য স্বতন্ত্রতা: শ্রীকৃষ্ণ এখানে নিজের, অর্জুনের এবং যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত সকল রাজাদের কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করে বুঝিয়েছেন যে আত্মার নিত্যতা তিন কালেই সত্য। তাই দেহের বিনাশের ভয়ে শোক করা অজ্ঞতা বৈ কিছুই নয়।

শ্লোক ১৩

দেহিনোঽস্মিন্যথা দেহে কৌমারং যৌবনং জরা ।
তথা দেহান্তরপ্রাপ্তির্ধীরস্তত্র ন মুহ্যতি ॥ ১৩ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: দেহিনঃ — অস্মিন্ — যথা — দেহে
  • দ্বিতীয় চরণ: কৌমারম্ — যৌবনম্ — জরা
  • তৃতীয় চরণ: তথা — দেহান্তর-প্রাপ্তিঃ
  • চতুর্থ চরণ: ধীরঃ — তত্র — ন — মুহ্যতি

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'দেহিনোঽস্মিন্' (দেহিনঃ + অস্মিন্) এবং 'দেহান্তরপ্রাপ্তির্ধীরস্তত্র' (দেহান্তর-প্রাপ্তিঃ + ধীরঃ + তত্র) পদগুলোর সন্ধি ও বিসর্গ ভেঙে স্বচ্ছ লয়ে উচ্চারণ করা প্রয়োজন।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: দেহিনঃ = দেহাভিমানী জীবাত্মার / জীবের; অস্মিন্ = এই; দেহে = স্থূলদেহে / শরীরে; যথা = যেমন; কৌমারম্ = শৈশব বা বাল্যকাল; যৌবনম্ = যৌবন বা তারুণ্য; জরা = বার্ধক্য / জরা; তথা = যেমনই / তদ্রূপ; দেহান্তরপ্রাপ্তিঃ = অন্য দেহ লাভ / নতুন শরীর প্রাপ্তি; ধীরঃ = ধীর বা পণ্ডিত ব্যক্তি; তত্র = তাহাতে / সেই বিষয়ে; ন = না; মুহ্যতি = মোহপ্রাপ্ত হন / বিভ্রান্ত হন

বঙ্গানুবাদ: "যেমন দেহধারী জীবের বর্তমান দেহেই ক্রমান্বয়ে বাল্য (কৌমার), যৌবন ও জরা (বার্ধক্য) প্রাপ্তি ঘটে, তেমনই মৃত্যুর পর অন্য দেহ প্রাপ্তিও ঘটে থাকে; আত্মতত্ত্বজ্ঞ ধীর ব্যক্তি তাহাতে মোহপ্রাপ্ত হন না।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • দেহের রূপান্তর বনাম আত্মার অপরিবর্তনীয়তা: এক জীবনের ভেতরেই মানুষের শৈশব, যৌবন ও বার্ধক্যের মধ্য দিয়ে স্থূলদেহের ক্রমাগত পরিবর্তন ঘটে, অথচ ভেতরের চেতনারূপী আত্মা একই থাকে।
  • মৃত্যু কেবল এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় গমন: বাল্য থেকে যৌবনে পৌঁছালে যেমন কেউ শোকে ব্যাকুল হয় না, তেমনই জরাজীর্ণ দেহ ত্যাগ করে অন্য নতুন দেহ ধারণ করাও আত্মার স্বাভাবিক রূপান্তর মাত্র।
  • 'ধীর' ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি: যিনি দেহ ও আত্মার এই পার্থক্য উপলব্ধি করেছেন, তিনি জন্ম বা মৃত্যুর ঘটনায় মোহগ্রস্ত বা বিচলিত হন না।

শ্লোক ১৪

শ্রীভগবানুবাচ —
মাত্রাস্পর্শাস্তু কৌন্তেয় শীতোষ্ণসুখদুঃখদাঃ ।
আগমাপায়িনোঽনিত্যাস্তাংস্তিতিক্ষস্ব ভারত ॥ ১৪ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: মাত্রাস্পর্শাঃ — তু — কৌন্তেয়
  • দ্বিতীয় চরণ: শীত-উষ্ণ-সুখ-দুঃখ-দাঃ
  • তৃতীয় চরণ: আগম-অপায়িনঃ — অনিত্যাঃ
  • চতুর্থ চরণ: তান্ — তিতিক্ষস্ব — ভারত

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'মাত্রাস্পর্শাস্তু' (মাত্রাস্পর্শাঃ + তু), 'শীতোষ্ণসুখদুঃখদাঃ' (শীত + উষ্ণ + সুখ + দুঃখ + দাঃ) এবং 'আগমাপায়িনোঽনিত্যাস্তাংস্তিতিক্ষস্ব' (আগম + অপায়িনঃ + অনিত্যাঃ + তান্ + তিতিক্ষস্ব) পদগুলোর বিসর্গ ও সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দে স্পষ্ট লয়ে উচ্চারণ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: কৌন্তেয় = হে কুন্তীপুত্র অর্জুন!; মাত্রাস্পর্শাঃ = বিষয়সমূহের সহিত ইন্দ্রিয়বৃত্তির সংযোগ বা অনুভূতিসমূহ; তু = কিন্তু; শীতোষ্ণসুখদুঃখদাঃ = শীত, উষ্ণ, সুখ এবং দুঃখ প্রদানকারী; আগমাপায়িনঃ = উৎপত্তি ও বিনাশশীল / গমনাগমনশীল; অনিত্যাঃ = অনিত্য / ক্ষণস্থায়ী; তান্ = সেই অনুভূতি বা বিষয়গুলোকে; তিতিক্ষস্ব = সহ্য করো / সহনশীল হও; ভারত = হে ভরতশ্রেষ্ঠ অর্জুন!

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "হে কৌন্তেয়! ইন্দ্রিয়বৃত্তির সহিত বিষয়ের সংযোগই শীত-গ্রীষ্ম এবং সুখ-দুঃখ প্রদান করে। কিন্তু এই অনুভূতিসমূহ গমনাগমনশীল ও অনিত্য; অতএব, হে ভারত! তুমি এগুলো ধৈর্যপূর্বক সহ্য করো।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • ইন্দ্রিয় স্পর্শ ও মানসিক প্রতিক্রিয়া: শীত বা উষ্ণতা যেভাবে ত্বকের স্পর্শে অনুভূত হয়, তেমনই সুখ ও দুঃখ হলো ইন্দ্রিয়ের সাথে বাইরের বিষয়ের সাময়িক সংযোগের ফলমাত্র।
  • 'আগমাপায়ী' ও অনিত্যতা: বাহ্যিক অনুভূতিগুলো চিরস্থায়ী নয়; ঋতু পরিবর্তনের মতো সুখ ও দুঃখ আসে আবার চলেও যায়। যা অনিত্য ও পরিবর্তনশীল, তা নিয়ে বিচলিত হওয়া জ্ঞানীর লক্ষণ নয়।
  • 'তিতিক্ষা' বা সহনশীলতার সাধনা: আধ্যাত্মিক জীবনের অন্যতম প্রধান গুণ হলো 'তিতিক্ষা' বা সুখ-দুঃখকে সমানভাবে সহ্য করার সামর্থ্য। আত্মতত্ত্ব জানতে হলে বাহ্যিক দ্বন্দ্বে বিচলিত না হয়ে ধৈর্য ধারণ করতে হয়।

শ্লোক ১৫

যং হি ন ব্যথয়ন্ত্যেতে পুরুষং পুরুষর্ষভ ।
সমদুঃখসুখং ধীরং সোঽমৃতত্বায় কল্পতে ॥ ১৫ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: যম্ — হি — ন — ব্যথয়ন্তি — এতে
  • দ্বিতীয় চরণ: পুরুষম্ — পুরুষর্ষভ
  • তৃতীয় চরণ: সম-দুঃখ-সুখম্ — ধীরম্
  • চতুর্থ চরণ: সঃ — অমৃতত্বায় — কল্পতে

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'ব্যথয়ন্ত্যেতে' (ব্যথয়ন্তি + এতে) এবং 'সোঽমৃতত্বায়' (সঃ + অমৃতত্বায়) পদগুলোর সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে স্পষ্ট ও গম্ভীরভাব বজায় রেখে উচ্চারণ করা প্রয়োজন।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: পুরুষর্ষভ = হে পুরুষশ্রেষ্ঠ অর্জুন!; এতে = এই সকল মাত্রাস্পর্শ বা অনুভূতি (সুখ-দুঃখ); যম্ পুরুষম্ = যে বিবেকী মানুষকে; ন ব্যথয়ন্তি = বিচলিত বা ব্যথিত করতে পারে না; সমদুঃখসুখম্ = সুখে ও দুঃখে সমভাবাপন্ন; ধীরম্ = ধীর বা প্রজ্ঞাবান পুরুষকে; সঃ হি = তিনিই; অমৃতত্বায় = মোক্ষ বা অমরত্ব লাভের জন্য; কল্পতে = সমর্থ বা যোগ্য হন

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "হে পুরুষশ্রেষ্ঠ অর্জুন! সুখে ও দুঃখে সমভাবাপন্ন যে ধীর পুরুষকে এই সকল ইন্দ্রিয়ানুভূতি বিচলিত করতে পারে না, তিনিই অমৃতত্ব বা মোক্ষ লাভের যোগ্য হন।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • তিতিক্ষার পরম ফল (অমৃতত্ব): আগের ১৪ নম্বর শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ শীত-গ্রীষ্ম ও সুখ-দুঃখ সহ্য করার উপদেশ দিয়েছিলেন; এই ১৫ নম্বর শ্লোকে সেই সহনশীলতার পরম লক্ষ্য ও ফল হিসেবে 'অমৃতত্ব' বা মুক্তি লাভের পরম আশ্বাস ব্যক্ত করেছেন।
  • সমভাব বা সাম্যযোগ: জীবনের লাভ-ক্ষতি, আনন্দ-বেদনা ও সুখ-দুঃখের মাঝে স্থির ও অবিচলিত থাকাই হলো আত্মজ্ঞানের মূল লক্ষণ। দ্বন্দ্বে বিচলিত না হওয়াই সাধককে জড়জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত করে।
  • 'পুরুষর্ষভ' ও 'ধীর' শব্দের তাৎপর্য: শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে 'পুরুষর্ষভ' (পুরুষদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ) বলে সম্বোধন করে তাঁর ভেতরের মহান সামর্থ্য স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন এবং ইন্দ্রিয়ানুভূতির ঊর্ধ্বে উঠে একজন 'ধীর' বা স্থিরপ্রজ্ঞ প্রজ্ঞাবান পুরুষ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

শ্লোক ১৬

নাসতো বিদ্যতে ভাবো নাভাবো বিদ্যতে সতঃ ।
উভয়োরপি দৃষ্টোঽন্তস্ত্বনয়োস্তত্ত্বদর্শিভিঃ ॥ ১৬ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: ন — অসতঃ — বিদ্যতে — ভাবঃ
  • দ্বিতীয় চরণ: ন — অভাবঃ — বিদ্যতে — সতঃ
  • তৃতীয় চরণ: উভয়োঃ — অপি — দৃষ্টঃ — অন্তঃ
  • চতুর্থ চরণ: তু — অনয়োঃ — তত্ত্বদর্শিভিঃ

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'নাসতো' (ন + অসতঃ), 'নাভাবো' (ন + অভাবঃ) এবং 'দৃষ্টোঽন্তস্ত্বনয়োস্তত্ত্বদর্শিভিঃ' (দৃষ্টঃ + অন্তঃ + তু + অনয়োঃ + তত্ত্বদর্শিভিঃ) পদগুলোর বিসর্গ ও সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে স্পষ্ট লয়ে উচ্চারণ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: অসতঃ = অসতের / অনিত্য বা পরিণামশীল বস্তুর; ভাবঃ = অস্তিত্ব বা নিত্য স্থায়িত্ব; ন বিদ্যতে = বিদ্যমান নাই / বিদ্যমান থাকে না; সতঃ = সতের / অবিনাশী নিত্যবস্তু আত্মার; অভাবঃ = অভাব বা বিনাশ; ন বিদ্যতে = নাই / ঘটে না; অনয়োঃ উভয়ोঃ অপি = এই উভয়েরই; তু = কিন্তু; অন্তঃ = তত্ত্ব বিচার বা শেষ সিদ্ধান্ত; তত্ত্বদর্শিভিঃ = তত্ত্বদর্শী ঋষি বা পণ্ডিতগণের দ্বারা; দৃষ্টঃ = প্রত্যক্ষ বা পর্যালোচিত হয়েছে

বঙ্গানুবাদ: "অসৎ অর্থাৎ পরিণামশীল ও নশ্বর দেহের কোনো নিত্য স্থায়িত্ব নেই এবং সৎ অর্থাৎ অবিনাশী নিত্যবস্তু আত্মার কোনোদিন অভাব বা বিনাশ নেই; তত্ত্বদর্শী পণ্ডিতগণের দ্বারা এইরূপে সৎ ও অসতের তত্ত্ব সূক্ষ্মভাবে বিচারিত ও পর্যালোচিত হয়েছে।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • সৎ ও অসতের তত্ত্বিক রূপ: গীতা অনুযায়ী 'অসৎ' হলো পরিবর্তনশীল জড়দেহ ও অনিত্য জাগতিক বিষয়সমূহ, যার স্থায়ী কোনো অস্তিত্ব নেই। অন্যদিকে 'সৎ' হলো অবিনাশী আত্মতত্ত্ব বা পরম সত্য, যার কোনো রূপান্তর বা বিনাশ সম্ভব নয়।
  • তত্ত্বদর্শীদের সিদ্ধান্ত: যাঁরা কেবল বাহ্যরূপ না দেখে বস্তু সত্তার গভীরে প্রবেশ করেছেন, সেই তত্ত্বদর্শী প্রজ্ঞাবানগণ অসৎ ও সতের এই চিরন্তন সীমারেখা প্রত্যক্ষ করেছেন।
  • অর্জুনের মোহাচ্ছন্নতা দূরীকরণ: অর্জুন দেহের বিনাশ আশঙ্কায় শোকাকুল হয়ে পড়েছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে স্পষ্ট জানান যে যা অনিত্য বা অসৎ (জড়দেহ), তার বিনাশ অবশ্যম্ভাবী এবং যা নিত্য বা সৎ (আত্মা), তার বিনাশ কোনোকালেই সম্ভব নয়; সুতরাং এ নিয়ে শোক করা সম্পূর্ণ নিরর্থক।

শ্লোক ১৭

অবিনাশি তু তদ্বিদ্ধি যেন সর্বমিদং ততম্ ।
বিনাশমব্যয়স্যাস্য ন কশ্চিৎ কর্তুমর্হতি ॥ ১৭ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: অবিনাশি — তু — তৎ — বিদ্ধি
  • দ্বিতীয় চরণ: যেন — সর্বম্ — ইদম্ — ততম্
  • তৃতীয় চরণ: বিনাশম্ — অব্যয়স্য — অস্য
  • চতুর্থ চরণ: ন — কশ্চিৎ — কর্তুম্ — অর্হতি

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'অব্যয়স্যাস্য' (অব্যয়স্য + অস্য) এবং 'কশ্চিৎকর্তুমর্হতি' (কশ্চিৎ + কর্তুম্ + অর্হতি) পদগুলোর সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে স্পষ্ট লয়ে উচ্চারণ করতে হয়።

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: অবিনাশি = বিনাশরহিত / ধ্বংসহীন; তু = কিন্তু; তৎ = সেই পরমাত্মা বা আত্মাকে; বিদ্ধি = জানবে; যেন =াঁর দ্বারা; সর্বম্ ইদম্ = এই দৃশ্যমান সমস্ত বিশ্ব বা সর্বশরীর; ততম্ = ব্যাপ্ত হয়ে রয়েছে; বিনাশম্ = বিনাশ বা ধ্বংস; অব্যয়স্য = অবিনাশী বা পরিবর্তনহীন আত্মার; অস্য = এই জীবাত্মার; ন কশ্চিৎ = কেউই না; কর্তুম্ অর্হতি = সম্পাদন করতে সমর্থ হয় না

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "যিনি এই সর্ব শরীর ব্যাপিয়া আছেন, সেই আত্মাকে অবিনাশী বলিয়া জানিও; কারণ নাশরহিত এই অব্যয় আত্মার বিনাশ সাধন করিতে কেহই সমর্থ হয় না।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • আত্মার সর্বব্যাপী চেতনা: জড়দেহের একটি নির্দিষ্ট স্থান থাকলেও, আত্মা চেতনা রূপে সমগ্র দেহে ব্যাপ্ত হয়ে থাকে।
  • অক্ষয় ও অব্যয় সত্তা: বিশ্বজগতের কোনো অস্ত্র, বস্তু বা শক্তি এই শাশ্বত আত্মাকে ধ্বংস বা বিকৃত করতে পারে না।
  • শোক ও ভয়ের অবসান: শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, কৌরবদের স্থূল শরীরের বিনাশ হলেও তাঁদের ভেতরে বিদ্যমান আত্মার কোনো ক্ষতি বা বিনাশ সম্ভব নয়; সুতরাং মৃত্যুর ভয়ে শোক প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিরর্থক।

শ্লোক ১৮

অন্তবন্ত ইমে দেহা নিত্যস্যোক্তাঃ শরীরিণঃ ।
অনাশিনোঽপ্রমেয়স্য তস্মাদ্যুধ্যস্ব ভারত ॥ ১৮ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: অন্তবন্তঃ — ইমে — দেহাঃ
  • দ্বিতীয় চরণ: নিত্যস্য — উক্তাঃ — শরীরিণঃ
  • তৃতীয় চরণ: অনাশিনঃ — অপ্রমেয়স্য
  • চতুর্থ চরণ: তস্মাৎ — যুধ্যস্ব — ভারত

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'নিত্যস্যোক্তাঃ' (নিত্যস্য + উক্তাঃ), 'অনাশিনোঽপ্রমেয়স্য' (অনাশিনঃ + অপ্রমেয়স্য) এবং 'তস্মাদ্যুধ্যস্ব' (তস্মাৎ + যুধ্যস্ব) পদগুলোর সন্ধি ও বিসর্গ ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে স্পষ্ট লয়ে উচ্চারণ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: ইমে দেহাঃ = এই সকল দৃশ্যমান স্থূল দেহসমূহ; অন্তবন্তঃ = নাশশীল / বিনাশপ্রাপ্তিযোগ্য; উক্তাঃ = বলা হয়ে থাকে / কথিত হয়; নিত্যস্য = সদা একরূপ বা শাশ্বত আত্মার; অনাশিনঃ = নাশরহিত / অবিনাশী আত্মার; অপ্রমেয়স্য = অতি সূক্ষ্ম হেতু পরিমাণের অতীত বা বুদ্ধির অগোচর; শরীরিণঃ = দেহাভিমানী জীবাত্মার; তস্মাৎ = অতএব / সে কারণে; ভারত = হে ভরতশ্রেষ্ঠ অর্জুন!; যুধ্যস্ব = যুদ্ধ করো / স্বধর্ম পালন করো

বঙ্গানুবাদ: "নিত্য, নাশরহিত ও অপ্রমেয় (পরিমাপের অতীত) জীবাত্মার এই দৃশ্যমান দেহগুলিই কেবল নাশশীল; অতএব হে ভারত! তুমি স্বধর্ম পরিত্যাগ না করে যুদ্ধ করো।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • দেহের নশ্বরতা বনাম আত্মার অবিনাশী রূপ: স্থূল শরীর অনিত্য এবং এর বিনাশ অবশ্যম্ভাবী, কিন্তু শরীরের ভেতরে বাস করা জীবাত্মা নিত্য, নাশরহিত ও অপ্রমেয়।
  • 'অপ্রমেয়' শব্দের গভীর অর্থ: প্রমাপক বা ইন্দ্রিয় দিয়ে আত্মাকে মাপা বা পরিমাপ করা যায় না; এটি জাগতিক পরিমাপ ও বুদ্ধির অতীত পরম সূক্ষ্ম সত্তা।
  • 'তস্মাদ্যুধ্যস্ব ভারত' (যুদ্ধের নির্দেশ): দেহের বিনাশ হলেও আত্মার কোনো ক্ষতি হয় না — এই আত্মতত্ত্ব প্রমাণের পর শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে ক্ষত্রিয় হিসেবে অধর্মের বিরুদ্ধে স্বধর্ম পালনে যুদ্ধ করার সরাসরি আহ্বান জানান।

শ্লোক ১৯

য এনং বেত্তি হন্তারং যশ্চৈনং মন্যতে হতম্ ।
উভৌ তৌ ন বিজানীতো নায়ং হন্তি ন হন্যতে ॥ ১৯ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: যঃ — এনম্ — বেত্তি — হন্তারম্
  • দ্বিতীয় চরণ: যঃ — চ — এনম্ — মন্যতে — হতম্
  • তৃতীয় চরণ: উভৌ — তৌ — ন — বিজানীতঃ
  • চতুর্থ চরণ: ন — অযম্ — হন্তি — ন — হন্যতে

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'যশ্চৈনং' (যঃ + চ + এনম্) এবং 'নাযং' (ন + অযম্) পদগুলোর সন্ধি ও বিসর্গ ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে স্পষ্ট লয়ে উচ্চারণ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: যঃ = যে ব্যক্তি; এনম্ = এই জীবাত্মাকে; বেত্তি = মনে করে / জানে; হন্তারম্ = বিনাশকর্তা বা হননকারী; যঃ চ = এবং যে ব্যক্তি; এনম্ = ইহাকে (আত্মাকে); মন্যতে = মনে করে; হতম্ = বিনষ্ট বা নিহত; তৌ উভৌ = তারা উভয়েই; ন বিজানীতঃ = অজ্ঞ / জানে না; অযম্ = এই জীবাত্মা; ন হন্তি = কাউকে বধ করে না; ন হন্যতে = কারোর দ্বারা নিহতও হয় না

বঙ্গানুবাদ: "যে ব্যক্তি এই আত্মাকে হননকর্তা মনে করে এবং যে ব্যক্তি ইহাকে নিহত বা বিনষ্ট মনে করে, তারা উভয়েই আত্মার স্বরূপ সম্বন্ধে অজ্ঞ; কারণ এই আত্মা কাউকে হনন করে না এবং কারোর দ্বারা নিহতও হয় না।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • দেহের বিনাশ বনাম আত্মার অসঙ্গতা: মানুষ অজ্ঞানতাবশত জড়দেহ ও আত্মাকে এক করে ফেলে। হত্যা করা বা নিহত হওয়া কেবল ভৌত দেহের রূপান্তর মাত্র; অবিনাশী আত্মায় এই ক্রিয়ার কোনো প্রভাব পড়ে না।
  • কর্তৃত্ববোধের বিভ্রান্তি: যে ব্যক্তি নিজেকে কোনো প্রাণীর বিনাশকারী মনে করে, সে অহংকার ও ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী। আত্মা প্রাকৃত ক্রিয়ার অতীত ও নিষ্ক্রিয় তত্ত্ব।
  • অর্জুনের শোক নিরসন: অর্জুন কৌরবদের বধ করার চিন্তায় পাপ ও শোক অনুভব করছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ এই তত্ত্বের মাধ্যমে স্পষ্ট করে দেন যে আত্মা অবধ্য, তাই কারোর মৃত্যুর কারণ হিসেবে নিজেকে কর্তা ভাবা প্রজ্ঞার লক্ষণ নয়।

শ্লোক ২০

ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিন্নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ ।
অজো নিত্যঃ শাশ্বতোঽয়ং পুরাণোন হন্যতে হন্যমানে শরীরে ॥ ২০ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: ন — জায়তে — ম্রিয়তে — বা — কদাচিৎ
  • দ্বিতীয় চরণ: ন — অযম্ — ভূত্বা — ভবিতা — বা — ন — ভূয়ঃ
  • তৃতীয় চরণ: অজঃ — নিত্যঃ — শাশ্বতঃ — অযম্ — পুরাণঃ
  • চতুর্থ চরণ: ন — হন্যতে — হন্যমানে — শরীরে

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'নায়ং' (ন + অযম্), 'ভবিতা বা ন ভূয়ঃ', 'শাশ্বতোঽয়ং' (শাশ্বতঃ + অযম্) পদগুলোর সন্ধি ও বিসর্গ ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে ধীর ও গম্ভীর লয়ে উচ্চারণ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: অযম্ = এই জীবাত্মা; কদাচিৎ = কখনও; ন জায়তে = জন্মায় না; বা ন ম্রিয়তে = অথবা মরে না; ভূত্বা বা = উৎপন্ন বা অস্তিত্ব লাভ করে; ভূয়ঃ ন ভবিতা = পুনরায় উৎপন্ন বা বর্ধিত হয় না; অজঃ = জন্মরহিত; নিত্যঃ = সর্বদা সমভাবে বিদ্যমান / সনাতন; শাশ্বতঃ = অপক্ষয়শূন্য বা ক্ষয়হীন; পুরাণঃ = ষড়্বিকাররহিত / নিত্য নবীন অথচ প্রাচীন; শরীরে হন্যমানে = স্থূল শরীর বিনষ্ট হলেও; ন হন্যতে = বিনষ্ট বা নিহত হয় না

বঙ্গানুবাদ: "এই আত্মা কখনও জন্মায় না বা মরে না; অথবা পুনঃ পুনঃ উৎপন্ন বা বর্ধিত হয় না। কারণ আত্মা জন্মরহিত, নিত্য, অপক্ষয়শূন্য এবং পুরাণ (নিত্য নবীন অথচ সনাতন); জন্ম-মরণশীল স্থূল শরীর বিনষ্ট হলেও আত্মার কোনো বিনাশ ঘটে না।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • দেহের ষড়্বিকার ও আত্মার অস্পর্শতা: জড়দেহের ছয়টি স্বাভাবিক রূপান্তর বা বিকার দেখা যায় — জন্ম, অস্তিত্ব, বৃদ্ধি, রূপান্তর, ক্ষয় এবং বিনাশ। কিন্তু অবিনাশী আত্মা অজ, নিত্য ও শাশ্বত হওয়ায় এই ষড়্বিকারের সম্পূর্ণ অতীত।
  • মৃত্যু কেবল দেহের রূপান্তর: অর্জুন স্বজন ও গুরুজনদের মৃত্যুর আশঙ্কায় যে শোক প্রকাশ করছিলেন, শ্রীকৃষ্ণ এই শ্লোকে স্পষ্ট জানান যে মৃত্যু কেবল জড়দেহের বিনাশ ঘটায়, ভেতরে বিদ্যমান চিরন্তন আত্মার বিনাশ ঘটানো কখনোই সম্ভব নয়।
  • 'পুরাণ' ও 'শাশ্বত' শব্দের গভীরতা: আত্মাকে 'পুরাণ' বলা হয়েছে কারণ এটি অনাদিকাল থেকে বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও সর্বদা নবীন ও অপরিবর্তনীয় থাকে।

শ্লোক ২১

বেদাবিনাশিনং নিত্যং য এনমজমব্যয়ম্ ।
কথং স পুরুষঃ পার্থ কং ঘাতয়তি হন্তি কম্ ॥ ২১ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: বেদ — অবিনাশিনম্ — নিত্যম্
  • দ্বিতীয় চরণ: যঃ — এনম্ — অজম্ — অব্যয়ম্
  • তৃতীয় চরণ: কথম্ — সঃ — পুরুষঃ — পার্থ
  • চতুর্থ চরণ: কম্ — ঘাতয়তি — হন্তি — কম্

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'বেদাবিনাশিনং' (বেদ + অবিনাশিনম্) এবং 'এনমজমব্যয়ম্' (এনম্ + অজম্ + অব্যয়ম্) পদগুলোর সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে স্পষ্ট লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: পার্থ = হে কুন্তীপুত্র অর্জুন!; যঃ = যে ব্যক্তি; এনম্ = এই জীবাত্মাকে; অবিনাশিনম্ = ধ্বংসরহিত বা অবিনাশী; নিত্যম্ = নিত্য বা শাশ্বত; অজম্ = জন্মরহিত; অব্যয়ম্ = ক্ষয়হীন বা রূপান্তরহীন; বেদ = জানেন বা উপলব্ধি করেন; সঃ পুরুষঃ = সেই প্রজ্ঞাবান পুরুষ; কথম্ = কীভাবে বা কী প্রকারে; কম্ = কাকে; ঘাতয়তি = হত্যা করান বা প্রেরণা দেন; হন্তি = নিজে হত্যা করেন; কম্ = কাকে

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "হে পার্থ! যে ব্যক্তি এই আত্মাকে অবিনাশী, নিত্য, অজ (জন্মরহিত) এবং অব্যয় (ক্ষয়হীন) বলে জানেন, সেই প্রজ্ঞাবান পুরুষ কীভাবে কাকে হত্যা করান, অথবা কাকেই বা নিজে হত্যা করেন?"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • কর্তৃত্ববোধ ও প্ররোচনার অবসান: আত্মতত্ত্বজ্ঞ প্রজ্ঞাবান পুরুষ জানেন যে আত্মা পরম শাশ্বত ও অবধ্য। তাই তিনি বাহ্যিক শারীরিক ক্রিয়ার মাঝে নিজেকে হত্যার কর্তাও মনে করেন না, কিংবা কাউকে হত্যা করানোর প্রেরক বা হেতুকর্তা হন না।
  • অর্জুনের পাপবোধের নিরসন: অর্জুন ভাবছিলেন যুদ্ধের ময়দানে স্বজনদের সংহার করলে তিনি 'হন্তা' বা ঘাতক হিসেবে মহাপাপে লিপ্ত হবেন। শ্রীকৃষ্ণ স্পষ্ট করেন যে, স্বধর্ম পালনার্থে অধর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা এবং কেবল স্থূলদেহের বিনাশ ঘটা আত্মতত্ত্বের বিচারে পাপ বা হত্যা নয়।
  • বিচারকের রূপক: একজন বিচারক যখন ন্যায়বিচারের স্বার্থে অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দেন, তখন তিনি ব্যক্তি হিসেবে 'হত্যাকারী' হন না। ঠিক তেমনই আত্মজ্ঞানে স্থিত হয়ে ধর্মসংগ্রামে অংশ নিলে অর্জুনকে কৌরবদের ব্যক্তিগত হত্যাকারী বলা চলে না।

শ্লোক ২২

বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায় নবানি গৃহ্ণাতি নরোঽপরাণি ।
তথা শরীরাণি বিহায় জীর্ণা-ন্যন্যানি সংয়াতি নবানি দেহী ॥ ২২ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: বাসাংসি — জীর্ণানি — যথা — বিহায়
  • দ্বিতীয় চরণ: নবানি — গৃহ্ণাতি — নরঃ — অপরাণি
  • তৃতীয় চরণ: তথা — শরীরাণি — বিহায় — জীর্ণানি
  • চতুর্থ চরণ: অন্যানি — সংয়াতি — নবানি — দেহী

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'নরোঽপরাণি' (নরঃ + অপরাণি) এবং 'জীর্ণান্যন্যানি' (জীর্ণানি + অন্যানি) পদগুলোর সন্ধি ও বিসর্গ ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে স্পষ্ট লয়ে উচ্চারণ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: বাসাংসি = বস্ত্র বা কাপড়সমূহ; জীর্ণানি = পুরোনো বা জরাজীর্ণ; যথা = যেমন; বিহায় = পরিত্যাগ করে; নবানি = নতুন; গৃহ্ণাতি = গ্রহণ করে; নরঃ = মানুষ; অপরাণি = অন্য বা অপরাপর (বস্ত্র); তথা = তেমনই / তদ্রূপ; শরীরাণি = স্থূল শরীরসমূহকে; বিহায় = পরিত্যাগ করে; জীর্ণানি = পুরোনো বা জরাজীর্ণ; অন্যানি = অন্য সব; সংয়াতি = প্রাপ্ত হয় / গমন করে; নবানি = নতুন (শরীর); দেহী = জীবাত্মা / দেহাভিমানী

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "যেমন মানুষ পুরোনো জরাজীর্ণ বস্ত্র পরিত্যাগ করে অন্য নতুন বস্ত্র গ্রহণ করে, তেমনই জীবাত্মা জরাজীর্ণ শরীর ত্যাগ করে অন্য নতুন শরীর গ্রহণ করে।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • বস্ত্র পরিবর্তনের সরল রূপক: শ্রীকৃষ্ণ জটিল আধ্যাত্মিক তত্ত্বকে অত্যন্ত সহজ একটি উদাহরণের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন। জামাকাপড় পুরোনো বা ছেঁড়া হয়ে গেলে মানুষ যেমন তা পরিবর্তন করে নতুন পোশাক পরে, আত্মা ঠিক তেমনই এক শরীর অকেজো ও বৃদ্ধ হলে তা ত্যাগ করে নতুন দেহ পরিধান করে।
  • মৃত্যুর ভয় ও শোকের অবসান: মৃত্যু কোনো ধ্বংস বা চিরসমাপ্তি নয়; এটি কেবল পোশাক বদলানোর মতো স্বাভাবিক এক রূপান্তর। তাই স্থূলদেহের পতনে ব্যাকুল হয়ে শোক প্রকাশ করা প্রজ্ঞাবান মানুষের লক্ষণ নয়।
  • আত্মার অমরত্ব ও দেহের অনিত্যতা: এই শ্লোক স্পষ্ট করে যে আত্মা অবিনাশী ও শাশ্বত, আর দৃশ্যমান এই স্থূল শরীরটি কেবল পরিবর্তনশীল এক বাহ্যিক পোশাকমাত্র।

শ্লোক ২৩

নৈনং ছিন্দন্তি শাস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ ।
ন চৈনং ক্লেদয়ন্ত্যাপো ন শোষয়তি মারুতঃ ॥ ২৩ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: ন — এনম্ — ছিন্দন্তি — শাস্ত্রাণি
  • দ্বিতীয় চরণ: ন — এনম্ — দহতি — পাবকঃ
  • তৃতীয় চরণ: ন — চ — এনম্ — ক্লেদয়ন্তি — আপঃ
  • চতুর্থ চরণ: ন — শোষয়তি — মারুতঃ

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'নৈনং' (ন + এনম্), 'ক্লেদয়ন্ত্যাপো' (ক্লেদয়ন্তি + আপঃ) পদগুলোর সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে স্পষ্ট ও গম্ভীর লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: ন = না; এনম্ = এই আত্মাকে; ছিন্দন্তি = ছেদন বা খণ্ড খণ্ড করতে পারে; শাস্ত্রাণি = তলোয়ার, বাণ প্রভৃতি অস্ত্রশস্ত্রসমূহ; দহতি = দগ্ধ বা দহন করতে পারে; পাবকঃ = অগ্নি; চ = এবং; ক্লেদয়ন্তি = সিক্ত বা আর্দ্র করতে পারে; আপঃ = জলধারা / জল; শোষয়তি = শুষ্ক করতে পারে; মারুতঃ = বায়ু বা বাতাস

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "কোনো অস্ত্রই এই আত্মাকে ছেদন করতে পারে না, অগ্নি একে দগ্ধ করতে পারে না, জল একে ভিজাতে বা সিক্ত করতে পারে না এবং বায়ু একে শুষ্ক করতে পারে না।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • প্রাকৃতিক শক্তির অস্পর্শতা: পঞ্চ মহাভূতের (ক্ষিতি, অপ্, তেজ, মরুৎ, ব্যোম) মধ্যে অগ্নি যে বস্তুকে পুড়িয়ে ফেলে, জল যাকে ভিজিয়ে গলিয়ে দেয়, আর বায়ু যাকে শুকিয়ে ফেলে — প্রকৃতির সেই কোনো ধ্বংসাত্মক উপাদানই পরম সূক্ষ্ম আত্মাকে স্পর্শ বা বিকৃত করতে পারে না।
  • পদার্থ ও চেতনার পার্থক্য: বিশ্বজগতের সমস্ত অস্ত্র বা ভৌত শক্তি কেবল রূপান্তরশীল ও জড়দেহের ওপর কাজ করে। কিন্তু আত্মা যেহেতু বস্তাতীত ও শুদ্ধ চৈতন্যস্বরূপ, তাই তা সর্বপ্রকার ভৌতিক আঘাতের অতীত ও শাশ্বত।
  • অর্জুনের শোক ও ভীতি নিরসন: অর্জুন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ধারালো অস্ত্রাঘাতে স্বজনদের মৃত্যুর আশঙ্কায় বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ এই পরম সত্য উদঘাটন করে অর্জুনকে বোঝান যে, যুদ্ধের কোনো অস্ত্র বা শক্তিই অবিনাশী আত্মাকে বিনাশ করতে সক্ষম নয়।

শ্লোক ২৪

অচ্ছেদ্যোঽযমদাহ্যোঽযমক্লেদ্যোঽশোষ্য এব চ ।
নিত্যঃ সর্বগতঃ স্থাণুরচলোঽয়ং সনাতনঃ ॥ ২৪ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: অচ্ছেদ্যঃ — অযম্ — অদাহ্যঃ — অযম্
  • দ্বিতীয় চরণ: অক্লেদ্যঃ — অশোষ্যঃ — এব — চ
  • তৃতীয় চরণ: নিত্যঃ — সর্বগতঃ — স্থাণুঃ
  • চতুর্থ চরণ: অচলঃ — অযম্ — সনাতনঃ

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'অচ্ছেদ্যোঽযমদাহ্যোঽযম' (অচ্ছেদ্যঃ + অযম্ + অদাহ্যঃ + অযম্) এবং 'স্থাণুরচলোঽয়ং' (স্থাণুঃ + অচলঃ + অযম্) পদগুলোর বিসর্গ ও সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে স্পষ্ট লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: অযম্ = এই আত্মা; অচ্ছেদ্যঃ = ছেদনের অযোগ্য / যাকে খণ্ড খণ্ড করা যায় না; অদাহ্যঃ = দাহনের অযোগ্য / যাকে পোড়ানো যায় না; অক্লেদ্যঃ = সিক্ত বা ভেজানোর অযোগ্য; অশোষ্যঃ = শুষ্ক বা শোষণের অযোগ্য; এব চ = এবং নিশ্চয়ই; নিত্যঃ = চিরকাল বিদ্যমান / শাশ্বত; সর্বগতঃ = সর্বব্যাপী / সর্বত্র বিদ্যমান; স্থাণুঃ = স্থিরস্বভাব / অপরিবর্তনীয়; অচলঃ = অচল / অবিচলিত; সনাতনঃ = অনাদি / সদাবিদ্যমান

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "এই আত্মা অচ্ছেদ্য, অদাহ্য, অক্লেদ্য এবং অশোষ্য। ইনি নিত্য, সর্বব্যাপী, স্থির, অবিচলিত এবং সনাতন।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • ২৩ নম্বর শ্লোকের সত্যকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা: আগের শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ বলেছিলেন যে অস্ত্র আত্মাকে কাটতে পারে না, অগ্নি দগ্ধ করতে পারে না, জল ভেজাতে পারে না এবং বায়ু শুষ্ক করতে পারে না। এই শ্লোকে সেই চার প্রকার গুণকেই নেতিবাচক বিশেষণ হিসেবে ব্যবহার করে 'অচ্ছেদ্য', 'অদাহ্য', 'অক্লেদ্য' ও 'অশোষ্য' পদের মাধ্যমে আত্মার নিত্যতাকে নিশ্চিত করেছেন।
  • আত্মার ৫টি ইতিবাচক বিশেষত্ব:
    • নিত্য: আত্মা অনাদিকাল থেকে অবিনাশীভাবে বর্তমান।
    • সর্বগত: আত্মা অতি সূক্ষ্ম হওয়ায় তা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সর্বত্র ব্যাপ্ত হয়ে থাকে।
    • স্থাণু: স্থির ও রূপান্তরহীন।
    • অচল: স্থান পরিবর্তনের প্রয়োজনহীন, কারণ তা আগেই সর্বব্যাপী।
    • সনাতন: স্থান, কাল ও পাত্রের অতীত অনাদি ও সনাতন সত্তা।
  • অর্জুনের শোক নিরসন: কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে স্বজনদের ক্ষতির ভয়ে ব্যাকুল অর্জুনকে শ্রীকৃষ্ণ স্মরণ করিয়ে দেন যে, যে পরমাত্মা সর্বব্যাপী ও অবিচলিত, তাঁর কোনো ক্ষয় বা ক্ষতি সাধন করা জাগতিক কোনো শক্তির পক্ষেই সম্ভব নয়।

শ্লোক ২৫

অব্যক্তোঽয়মচিন্ত্যোঽয়মবিকার্যোঽয়মুচ্যতে ।
তস্মাদেবং বিদিত্বৈনং নানুশোচিতুমর্হসি ॥ ২৫ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: অব্যক্তঃ — অযম্ — অচিন্ত্যঃ — অযম্
  • দ্বিতীয় চরণ: অবিকার্যঃ — অযম্ — উচ্যতে
  • তৃতীয় চরণ: তস্মাৎ — এবম্ — বিদিত্বা — এনম্
  • চতুর্থ চরণ: ন — অনুশোচিতুম্ — অর্হসি

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'অব্যক্তোঽয়মচিন্ত্যোঽয়মবিকার্যোঽয়মুচ্যতে' (অব্যক্তঃ + অযম্ + অচিন্ত্যঃ + অযম্ + অবিকার্যঃ + অযম্ + উচ্যতে) এবং 'বিদিত্বৈনং নানুশোচিতুমর্হসি' (বিদিত্বা + এনম্ + ন + অনুশোচিতুম্ + অর্হসি) পদগুলোর সন্ধি ও বিসর্গ ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে স্পষ্ট লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: অযম্ = এই আত্মা; অব্যক্তঃ = অব্যক্ত / অতি সূক্ষ্মতার কারণে ইন্দ্রিয়ের অগোচর; অচিন্ত্যঃ = অচিন্ত্য / প্রাকৃত মন বা তর্কের অতীত; অবিকার্যঃ = অবিকার্য / জন্ম-মৃত্যু আদি ষড়্বিকারহীন বা রূপান্তরহীন; উচ্যতে = বলা হয়ে থাকে / কথিত হন; তস্মাৎ = অতএব / সে কারণে; এবম্ = এইরূপ; বিদিত্বা = জেনে / অবগত হয়ে; এনম্ = এই আত্মাকে; ন = না; অনুশোচিতুম্ = শোক বা অনুশোচনা করা; অর্হসি = উচিত / যোগ্য হও

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "এই জীবাত্মা অব্যক্ত (ইন্দ্রিয়ের অগ্রাহ্য), অচিন্ত্য (মনের ধারণার অতীত) এবং অবিকার্য (বিকাররহিত) বলে কথিত হন। অতএব, এই আত্মাকে এইরূপ অবগত হয়ে তোমার শোক করা অনুচিত।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • আত্মার ৩টি অনন্য বৈশিষ্ট্য:
    • অব্যক্ত: আত্মা জাগতিক চোখের দৃশ্য বা কোনো ভৌতিক ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে প্রকাশ্য নয়।
    • অচিন্ত্য: বস্তুজগতের চিন্তাভাবনা বা বৈষয়িক তর্ক দিয়ে আত্মতত্ত্বকে পরিমাপ করা যায় না।
    • অবিকার্য: জন্ম, স্থায়িত্ব, বৃদ্ধি, পরিবর্তন, ক্ষয় এবং বিনাশ — জড়দেহের এই ছয় প্রকার বিকার আত্মাকে স্পর্শ করতে পারে না।
  • শোকের চূড়ান্ত নিরসন: শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে স্পষ্ট জানান যে, যে আত্মাকে খণ্ডন করা যায় না, পোড়ানো যায় না, যা অব্যক্ত ও অবিকার্য — সেই শাশ্বত সত্তার জন্য শোকে আচ্ছন্ন হওয়া প্রজ্ঞাবান বীরের জন্য একেবারেই শোভা পায় না।

শ্লোক ২৬

অথ চৈনং নিত্যজাতং নিত্যং বা মন্যসে মৃতম্ ।
তথাপি ত্বং মহাবাহো নৈবং শোচিতুমর্হসি ॥ ২৬ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: অথ — চ — এনম্ — নিত্যজাতম্
  • দ্বিতীয় চরণ: নিত্যম্ — বা — মন্যসে — মৃতম্
  • তৃতীয় চরণ: তথাপি — ত্বম্ — মহাবাহো
  • চতুর্থ চরণ: ন — এবম্ — শোচিতুম্ — অর্হসি

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'চৈনং' (চ + এনম্) এবং 'নৈবং' (ন + এবম্) পদগুলোর সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে স্পষ্ট লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: অথ চ = আর যদিও / অথবা; এনম্ = এই আত্মাকে; নিত্যজাতম্ = সতত বা নিরন্তর উৎপন্ন; নিত্যম্ বা = অথবা নিরন্তর; মন্যসে = মনে কর; মৃতম্ = বিনাশশীল বা মৃত; তথাপি = তাহা হইলেও; ত্বম্ = তুমি; মহাবাহো = হে বীরশ্রেষ্ঠ/মহাবাহু অর্জুন!; ন = না; এবম্ = এইরূপ; শোচিতুম্ = শোক করিতে; অর্হসি = যোগ্য হও / উচিত

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "হে মহাবাহো! আর যদি তুমি এই আত্মাকে সতত জন্মশীল এবং সতত মরণশীল বলেও মনে কর, তবুও তোমার এইরূপে শোক প্রকাশ করা উচিত নয়।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • বিকল্প যুক্তির অবতারণা (অভ্যুপগম বাদ): আগের শ্লোকগুলোতে শ্রীকৃষ্ণ আত্মাকে অবিনাশী ও নিত্য বলে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এই ২৬ নম্বর শ্লোকে তিনি অর্জুনের মনস্তাত্ত্বিক বিভ্রান্তি দূর করতে একটি বিকল্প যুক্তির আশ্রয় নিয়েছেন। যদি লৌকিক বা জড়বাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ধরেও নেওয়া হয় যে দেহের সাথে সাথে আত্মার নিত্য জন্ম ও মৃত্যু ঘটে, তবুও শোক করার কোনো যৌক্তিক কারণ থাকে না।
  • প্রাকৃতিক নিয়মের অনিবার্যতা: যদি জন্ম ও মৃত্যু প্রতিনিয়ত ঘটে চলা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হয়, তবে তা রোধ করা কারোর পক্ষেই সম্ভব নয়। যা অপরিহার্য ও প্রাকৃত নিয়ম, তার জন্য শোক করা প্রজ্ঞার লক্ষণ নয়।
  • 'মহাবাহো' সম্বোধনের তাৎপর্য: শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে 'মহাবাহু' (মহাবীর) বলে সম্বোধন করে তাঁর শৌর্য ও ধৈর্যকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, যাতে তিনি বুঝতে পারেন যে পরম পরমাত্মার দৃষ্টিতেই হোক কিংবা জাগতিক পরিবর্তনের বিচারেই হোক — কোনো অবস্থাতেই শোকাকুল হওয়া এক বীরের জন্য শোভনীয় নয়।

শ্লোক ২৭

জাতস্য হি ধ্রুবো মৃত্যুর্ধ্রুবং জন্ম মৃতস্য চ ।
তস্মাদপরিহার্যেঽর্থে ন ত্বং শোচিতুমর্হসি ॥ ২৭ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: জাতস্য — হি — ধ্রুবঃ — মৃত্যুঃ
  • দ্বিতীয় চরণ: ধ্রুবম্ — জন্ম — মৃতস্য — চ
  • তৃতীয় চরণ: তস্মাৎ — অপরিহার্যে — অর্থে
  • চতুর্থ চরণ: ন — ত্বম্ — শোচিতুম্ — অর্হসি

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'ধ্রুবো মৃত্যুর্ধ্রুবং' (ধ্রুবঃ + মৃত্যুঃ + ধ্রুবম্) এবং 'তস্মাদপরিহার্যেঽর্থে' (তস্মাৎ + অপরিহার্যে + অর্থে) পদগুলোর বিসর্গ ও সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে ধীর ও স্পষ্ট লয়ে উচ্চারণ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: জাতস্য = জন্মগ্রহণকারীর / জাত ব্যক্তির; হি = যেহেতু / নিশ্চয়ই; ধ্রুবঃ = সুনিশ্চিত / অবশ্যম্ভাবী; মৃত্যুঃ = মৃত্যু বা মরণ; ধ্রুবম্ = সুনিশ্চিত; জন্ম = পুনর্জন্ম; মৃতস্য = মৃত ব্যক্তির; চ = এবং; তস্মাৎ = অতএব / সে কারণে; অপরিহার্যে = এড়ানো অসম্ভব বা অবশ্যম্ভাবী; অর্থে = বিষয়ে; ন = না; ত্বম্ = তুমি; শোচিতুম্ = শোক করতে; অর্হসি = উচিত / যোগ্য

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "যেহেতু জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তির মৃত্যু সুনিশ্চিত এবং মৃত ব্যক্তির কর্মফল ভোগের জন্য পুনরায় জন্মও সুনিশ্চিত; অতএব এই অপরিহার্য ও অবশ্যম্ভাবী বিষয়ে তোমার শোক করা অনুচিত।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • জন্ম ও মৃত্যুর সুনিশ্চিত চক্র: প্রাকৃত নিয়মে যার উৎপত্তি আছে, তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী, আর কর্মফলের বিধান অনুসারে মৃত সত্তার পুনরায় জন্মও সুনিশ্চিত।
  • অপরিহার্য বিষয়ের শোকের অযৌক্তিকতা: যা এড়ানো বা পরিবর্তন করা অসম্ভব, তাকে নিয়ে শোক প্রকাশ করা প্রজ্ঞাবান মানুষের লক্ষণ নয়।
  • কর্তব্য পালনের তাগিদ: জন্ম-মৃত্যুর অপরিহার্য সত্যকে মেনে নিয়ে মোহাচ্ছন্ন না হয়ে স্বধর্ম পালনে অগ্রসর হওয়াই বীরের লক্ষণ।

শ্লোক ২৮

অব্যক্তাদীনি ভূতানি ব্যক্তমধ্যানি ভারত ।
অব্যক্তনিধনান্যেব তত্র কা পরিদেবনা ॥ ২৮ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: অব্যক্তাদীনি — ভূতানি — ব্যক্তমধ্যানি — ভারত
  • দ্বিতীয় চরণ: অব্যক্তনিধনানি — এব — তত্র — কা — পরিদেবনা

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'অব্যক্তনিধনান্যেব' (অব্যক্তনিধনানি + এব) পদটির সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে স্পষ্ট ও ধীর লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: ভারত = হে ভরতশ্রেষ্ঠ অর্জুন (ভরতবংশজাত সম্বোধন); ভূতানি = প্রাণিগণ / জীবসমূহ; অব্যক্তাদীনি = সৃষ্টির পূর্বে অপ্রকাশিত বা রূপহীন; ব্যক্তমধ্যানি = জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী সময়ে প্রকাশিত; অব্যক্তনিধনানি = বিনাশের পর পুনরায় অপ্রকাশিত / অব্যক্ত; এব = নিশ্চয়ই / অবশ্যই; তত্র = সেই বিষয়ে; কা = কী; পরিদেবনা = শোক বা বিলাপ

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "হে ভারত! সকল জীব সৃষ্টির পূর্বে অপ্রকাশিত (অব্যক্ত) ছিল, কেবল জন্ম থেকে মৃত্যুর মধ্যবর্তী সময়ে প্রকাশিত থাকে এবং মৃত্যুর পর পুনরায় অপ্রকাশিত (অব্যক্ত) হয়ে যায়; সুতরাং এই বিষয়ে শোক বা বিলাপ করার কী কারণ থাকতে পারে?"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • জীবের ত্রিবিধ অবস্থা: সমস্ত প্রাণীর রূপ বা অস্তিত্ব তিনটি ধাপে বিভক্ত — জন্মের পূর্বে জীব অব্যক্ত বা অপ্রকাশিত থাকে, জীবনের মধ্যভাগে ক্ষণকালের জন্য দৃশ্যমান বা প্রকাশিত হয়, আর মৃত্যুর পর পুনরায় সেই অব্যক্ত অবস্থায় ফিরে যায়।
  • শোকের নিরর্থকতা: যা আদিতে ছিল না এবং অন্তেও থাকবে না, কেবল মাঝে কিছুকালের জন্য প্রকাশিত হয়, তাকে ঘিরে মোহ ও বিলাপ করা প্রজ্ঞার লক্ষণ নয়।
  • প্রাকৃতিক সত্যকে স্বীকার করা: জলতরঙ্গ যেমন সমুদ্র থেকে উঠে আবার সমুদ্রেই মিলিয়ে যায়, তেমনই সমস্ত জীব প্রাকৃত নিয়মে অব্যক্ত অবস্থা থেকে এসে আবার অব্যক্তেই বিলীন হয়; তাই তত্ত্বজ্ঞানী পুরুষগণ এই অবধারিত সত্যকে অনুধাবন করে সমভাব বজায় রাখেন।

শ্লোক ২৯

আশ্চর্যবৎ পশ্যতি কশ্চিদেন-মাশ্চর্যবদ্বদতি তথৈব চান্যঃ ।
আশ্চর্যবচ্চৈনমন্যঃ শৃণোতি শ্রুত্বাপ্যেনং বেদ ন চৈব কশ্চিৎ ॥ ২৯ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: আশ্চর্যবৎ — পশ্যতি — কশ্চিৎ — এনম্
  • দ্বিতীয় চরণ: আশ্চর্যবৎ — বদতি — তথা — এব — চ — অন্যঃ
  • তৃতীয় চরণ: আশ্চর্যবৎ — চ — এনম্ — অন্যঃ — শৃণোতি
  • চতুর্থ চরণ: শ্রুত্বা — অপি — এনম্ — বেদ — ন — চ — এব — কশ্চিৎ

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'কশ্চিদেনমাশ্চর্যবদ্বদতি' (কশ্চিৎ + এনম্ + আশ্চর্যবৎ + বদতি), 'আশ্চর্যবচ্চৈনমন্যঃ' (আশ্চর্যবৎ + চ + এনম্ + অন্যঃ) এবং 'শ্রুত্বাপ্যেনং' (শ্রুত্বা + অপি + এনম্) পদগুলোর সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে ধীর ও গম্ভীর লয়ে উচ্চারণ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: কশ্চিৎ = কেউ কেউ / কোনো সাধক; এনম্ = এই আত্মাকে; আশ্চর্যবৎ = আশ্চর্যজনকভাবে / পরম বিস্ময়স্বরূপ; পশ্যতি = দর্শন করেন; তথা এব চ = তদ্রূপ / তেমনই; অন্যঃ = অপর ব্যক্তি; বদতি = বর্ণনা করেন; শৃণোতি = শ্রবণ করেন; শ্রুত্বা অপি = শুনেও / শ্রবণ করার পরও; ন বেদ = বুঝতে বা জানতে পারেন না

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "কেহ কেহ এই আত্মাকে আশ্চর্যবৎ দর্শন করেন, অপরে ইহাকে আশ্চর্যবৎ বর্ণনা করেন, অন্য কেহ ইহাকে আশ্চর্যস্বরূপ শ্রবণ করেন এবং শ্রবণ করার পরও অনেকে এই আত্মাকে উপলব্ধি করিতে বা বুঝতে পারেন না।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • আত্মার পরম বিস্ময় ও দুর্লভতা: আত্মতত্ত্ব প্রাকৃত মন, বুদ্ধি ও ইন্দ্রিয়ানুভূতির অতীত। তাই এই পরম সত্যকে যিনি উপলব্ধি করেন, যিনি বর্ণনা করেন কিংবা যিনি শ্রবণ করেন — সবার কাছেই এটি এক পরম আশ্চর্য ও অলৌকিক ব্যাপার।
  • শ্রবণ ও প্রকৃত অনুভূতির ফারাক: কেবল শাস্ত্রজ্ঞান অর্জন বা মুখে আলোচনা করলেই আত্মাকে উপলব্ধি করা যায় না। বহুল শ্রবণের পরও ঈশ্বরীয় কৃপা ও আত্মদর্শন ছাড়া পরম আত্মজ্ঞান লাভ অত্যন্ত দুষ্প্রাপ্য।
  • অর্জুনের মোহাচ্ছন্নতা নিরসন: অর্জুনকে শ্রীকৃষ্ণ স্মরণ করিয়ে দেন যে, বাহ্যিক নশ্বরদেহের মায়ায় বিচলিত না হয়ে এই অতি সূক্ষ্ম ও পরম বিস্ময়কর আত্মতত্ত্বকেই হৃদয়ে ধারণ করা উচিত।

শ্লোক ৩০

দেহী নিত্যমবধ্যোঽয়ং দেহে সর্বস্য ভারত ।
তস্মাৎ সর্বাণি ভূতানি ন ত্বং শোচিতুমর্হসি ॥ ৩০ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: দেহী — নিত্যম্ — অবধ্যঃ — অযম্
  • দ্বিতীয় চরণ: দেহে — সর্বস্য — ভারত
  • তৃতীয় চরণ: তস্মাৎ — সর্বাণি — ভূতানি
  • চতুর্থ চরণ: ন — ত্বম্ — শোচিতুম্ — অর্হসি

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'দেহী নিত্যমবধ্যোঽয়ং' (দেহী + নিত্যম্ + অবধ্যঃ + অযম্) পদটির বিসর্গ ও সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে স্পষ্ট লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: ভারত = হে ভরতশ্রেষ্ঠ অর্জুন (ভরতবংশজাত সম্বোধন); অযম্ = এই; দেহী = দেহধারী জীবাত্মা / আত্মা; সর্বস্য দেহে = সকল প্রাণীর শরীরে; নিত্যম্ = সর্বদা / চিরকাল; অবধ্যঃ = অবধ্য / যাঁর বিনাশ বা বধ করা সম্ভব নয়; তস্মাৎ = অতএব / সে কারণে; ত্বম্ = তুমি; সর্বাণি ভূতানি = সকল জীবের জন্য / কোনো প্রাণীর নিমিত্ত; ন শোচিতুম্ অর্হসি = শোক করতে পার না / শোক প্রকাশ করা অনুচিত

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "হে ভারত (অর্জুন)! সকল প্রাণীর দেহে অবস্থানকারী এই জীবাত্মা সর্বদা অবধ্য; অতএব তুমি কোনো প্রাণীর জন্যই শোক করতে পার না।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • আত্মতত্ত্বের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত: দ্বিতীয় অধ্যায়ের ১১ নম্বর শ্লোক থেকে শুরু হওয়া শ্রীকৃষ্ণের পরম আত্মজ্ঞান বা সাংখ্যযোগের আলোচনার এটি একটি পরম সিদ্ধান্তমূলক শ্লোক। শ্রীকৃষ্ণ এখানে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত প্রদান করেন যে, কেবল অর্জুনের পক্ষের বা বিপক্ষীয় যোদ্ধাগণই নন, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সকল প্রাণীর দেহাভ্যন্তরে অবস্থানকারী আত্মাই অবধ্য ও অমর।
  • সকল জীবের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সার্বজনীন সত্য: এই শ্লোকে 'সর্বস্য দেহে' (সকলের দেহে) এবং 'সর্বাণি ভূতানি' (সকল প্রাণীর জন্য) পদ দুটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আত্মজ্ঞান কেবল বিশেষ কোনো ব্যক্তি বা যোদ্ধার জন্য নয়, বরং পৃথিবীর সমস্ত জীবসত্তার ক্ষেত্রেই সত্য — কারণ স্থূলদেহের বিনাশ ঘটলেও ভেতরে বিরাজমান প্রজ্ঞারূপ আত্মা কখনোই বিনষ্ট হয় না।
  • শোকের পরম সমাপ্তি: অর্জুন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে স্বজন হারানো এবং প্রাণীবধের ভয়ে আকুল হয়ে পড়েছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ এই শ্লোকের মাধ্যমে অর্জুনের সমস্ত শোক ও মোহের মূল উপড়ে ফেলেন এবং স্মরণ করিয়ে দেন যে, যেহেতু আত্মা অবধ্য, তাই কারোর জন্যই অনুশোচনা বা বিলাপ করা সংগত নয়।
  • পরবর্তী আলোচনার সূচনা: এই ৩০ নম্বর শ্লোকের মাধ্যমে আত্মতত্ত্ব (সাংখ্যযোগ)-এর তাত্ত্বিক আলোচনার ইতি টেনে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের সামাজিক ও ব্যবহারিক দায়িত্ব অর্থাৎ 'ক্ষাত্রধর্ম' এবং স্বধর্ম পালনের নির্দেশ (৩১ নম্বর শ্লোক থেকে) প্রদান শুরু করবেন।

শ্লোক ৩১

স্বধর্মমপি চাবেক্ষ্য ন বিকম্পিতুমর্হসি ।
ধর্ম্যাদ্ধি যুদ্ধাচ্ছ্রেয়োঽন্যৎ ক্ষত্রিয়স্য ন বিদ্যতে ॥ ৩১ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: স্বধর্মম্ — অপি — চ — অবেক্ষ্য
  • দ্বিতীয় চরণ: ন — বিকম্পিতুম্ — অর্হসি
  • তৃতীয় চরণ: ধর্ম্যাৎ — হি — যুদ্ধাৎ — শ্রেয়ঃ — অন্যৎ
  • চতুর্থ চরণ: ক্ষত্রিয়স্য — ন — বিদ্যতে

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'স্বধর্মমপি' (স্বধর্মম্ + অপি), 'চাবেক্ষ্য' (চ + অবেক্ষ্য) এবং 'যুদ্ধাচ্ছ্রেয়োঽন্যৎ' (যুদ্ধাৎ + শ্রেয়ঃ + অন্যৎ) পদগুলোর সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে স্পষ্ট লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: স্বধর্মম্ = নিজের ধর্ম বা বর্ণাশ্রম বিচারে ক্ষাত্রধর্ম; অপি = এমনকি; চ = এবং; অবেক্ষ্য = পর্যালোচনা বা বিচার করে; ন = না; বিকম্পিতুম্ = বিচলিত বা ভীত হতে; অর্হসি = উচিত বা যোগ্য হও; ধর্ম্যাৎ = ধর্মসম্মত বা ন্যায়সংগত; হি = যেহেতু / কারণ; যুদ্ধাৎ = যুদ্ধ অপেক্ষা; শ্রেয়ঃ = অধিকতর কল্যাণকর বা পরম শ্রেয়; অন্যৎ = অপর বা অন্য কোনো; ক্ষত্রিয়স্য = ক্ষত্রিয়ের পক্ষে; ন বিদ্যতে = বিদ্যমান নেই

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "আর স্বধর্মের (ক্ষাত্রধর্মের) প্রতি লক্ষ্য করলেও তোমার বিচলিত বা ভীত হওয়া উচিত নয়; কারণ ক্ষত্রিয়ের জন্য ধর্মযুদ্ধ অপেক্ষা অধিক শ্রেয়স্কর বা পরম মঙ্গলজনক অন্য কিছুই হতে পারে না।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • পরমতত্ত্ব থেকে সামাজিক কর্তব্যে অবতরণ: আগের শ্লোকগুলোতে শ্রীকৃষ্ণ আত্মার নিত্যতা ও অবধ্যতার পরমতত্ত্ব বিচার শেষ করেছেন। এই শ্লোক থেকে তিনি অর্জুনকে একজন যোদ্ধা বা 'ক্ষত্রিয়' হিসেবে তাঁর পার্থিব সামাজিক কর্তব্য পালনে উদ্যমী হওয়ার আহ্বান জানান।
  • ক্ষত্রিয় ধর্মে 'ধর্মযুদ্ধ'-এর গুরুত্ব: সামাজিক শান্তি, ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায়ের প্রতিরোধের জন্য প্রতিরোধ গড়ে তোলাই ক্ষত্রিয়ের 'স্বধর্ম'। তাই ধর্মসম্মত যুদ্ধের সুযোগ উপস্থিত হলে সেখান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া বা বিচলিত হওয়া ক্ষত্রিয়ের পক্ষে সম্পূর্ণ অনুচিত।
  • মোক্ষ ও স্বধর্মের সামঞ্জস্য: স্বধর্ম পালন কেবল লৌকিক কর্তব্য নয়, অনাসক্ত হয়ে নিজ কর্তব্য সম্পাদন করাই সাধককে আত্মজ্ঞানের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

শ্লোক ৩২

যদৃচ্ছয়া চোপপন্নং স্বর্গদ্বারমপাবৃতম্ ।
সুখিনঃ ক্ষত্রিয়াঃ পার্থ লভন্তে যুদ্ধমীদৃশম্ ॥ ৩২ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: যদৃচ্ছয়া — চ — উপপন্নম্
  • দ্বিতীয় চরণ: স্বর্গদ্বারম্ — অপাবৃতম্
  • তৃতীয় চরণ: সুখিনঃ — ক্ষত্রিয়াঃ — পার্থ
  • চতুর্থ চরণ: লভন্তে — যুদ্ধম্ — ঈদৃশম্

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'চোপপন্নং' (চ + উপপন্নম্) এবং 'স্বর্গদ্বারমপাবৃতম্' (স্বর্গদ্বারম্ + অপাবৃতম্) পদগুলোর সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে স্পষ্ট লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: পার্থ = হে কুন্তীপুত্র অর্জুন (পৃথাপুত্র সম্বোধন); যদৃচ্ছয়া = অপ্রার্থিতভাবে / অনায়াসে বা স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে; চ = এবং; উপপন্নম্ = উপস্থিত / প্রাপ্ত; স্বর্গদ্বারম্ = স্বর্গের দ্বারস্বরূপ; অপাবৃতম্ = উন্মুক্ত / উদ্ঘাটিত; সুখিনঃ = সৌভাগ্যবানগণ; ক্ষত্রিয়াঃ = ক্ষত্রিয়গণ; লভন্তে = লাভ করেন; যুদ্ধম্ = যুদ্ধ; ঈদৃশম্ = সেইরূপ

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "হে পার্থ! স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে বা অনায়াসে উপস্থিত হওয়া উন্মুক্ত স্বর্গদ্বারস্বরূপ এইরূপ ধর্মযুদ্ধ সৌভাগ্যবান ক্ষত্রিয়গণই লাভ করে থাকেন।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • ধর্মযুদ্ধের সৌভাগ্য: আগের ৩১ নম্বর শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ ক্ষত্রিয়ের স্বধর্ম হিসেবে ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেছিলেন। এই ৩২ নম্বর শ্লোকে তিনি জানান যে স্বতঃপ্রবৃত্তভাবে এমন ধর্মযুদ্ধের সুযোগ লাভ করা ক্ষাত্রকুলে পরম সৌভাগের লক্ষণ।
  • 'স্বর্গদ্বারমপাবৃতম্' (উন্মুক্ত স্বর্গদ্বার): অন্যায়ের বিরুদ্ধে স্বধর্ম পালনে যুদ্ধক্ষেত্র হলো সরাসরি স্বর্গের উন্মুক্ত দ্বারস্বরূপ। যুদ্ধে জয়লাভ করলে যেমন রাজ্য ভোগ হয়, তেমনই বীরগতি লাভ করলে স্বর্গের দ্বারে প্রবেশ সুনিশ্চিত হয়।
  • 'সুখিনঃ ক্ষত্রিয়াঃ' (সৌভাগ্যবান ক্ষত্রিয়): শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, সমাজের ন্যায় ও সত্য রক্ষায় আত্মনিয়োগ করার এমন সুযোগ সকল বীরের ভাগ্যে সহজে আসে না; তাই এই সুযোগ হেলায় হারানো অনুচিত।

শ্লোক ৩৩

অথ চেত্ত্বমিমং ধর্ম্যং সংগ্রামং ন করিষ্যসি ।
ততঃ স্বধর্মং কীর্তিং চ হিত্বা পাপমবাপ্স্যসি ॥ ৩৩ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: অথ — চেৎ — ত্বম্ — ইমম্ — ধর্ম্যম্
  • দ্বিতীয় চরণ: সংগ্রামম্ — ন — করিষ্যসি
  • তৃতীয় চরণ: ততঃ — স্বধর্মম্ — কীর্তিম্ — চ — হিত্বা
  • চতুর্থ চরণ: পাপম্ — অবাপ্স্যসি

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'চেত্ত্বমিমং' (চেৎ + ত্বম্ + ইমম্) এবং 'পাপমবাপ্স্যসি' (পাপম্ + অবাপ্স্যসি) পদগুলোর সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে স্পষ্ট লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: অথ চেৎ = পক্ষান্তরে / আর যদি; ত্বম্ = তুমি; ইমম্ = এই; ধর্ম্যম্ = ধর্মসংগত / ন্যায়সংগত; সংগ্রামম্ = যুদ্ধ বা সংগ্রাম; ন করিষ্যসি = না করো; ততঃ = তবে / তাহা হইলে; স্বধর্মম্ = ক্ষত্রিয় হিসেবে নিজের কর্তব্য বা স্বধর্ম; কীর্তিম্ চ = এবং অর্জিত যশ বা কীর্তি; হিত্বা = হারিয়ে / পরিত্যাগ করিয়া; পাপম্ = পাপ; অবাপ্স্যসি = লাভ করবে / প্রাপ্ত হইবে

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "কিন্তু তুমি যদি এই ধর্মসংগত যুদ্ধ না করো, তবে স্বধর্ম ও অর্জিত কীর্তি হারিয়ে পাপগ্রস্ত হবে।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • স্বধর্ম ত্যাগের পরিণাম: আগের শ্লোকগুলোতে শ্রীকৃষ্ণ ধর্মযুদ্ধের সুফল (রাজ্য ভোগ বা স্বর্গলাভ) তুলে ধরেছিলেন; এই ৩৩ নম্বর শ্লোকে তিনি অর্জুনকে কর্তব্যবিমুখতার মারাত্মক নৈতিক ও আধ্যাত্মিক পরিণাম সম্পর্কে সচেতন করেছেন।
  • পাপের সংজ্ঞা: ক্ষত্রিয়ের প্রধান ধর্ম হলো সমাজ ও ন্যায় রক্ষা করা। অন্যায়কে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়া স্বধর্মের অবমাননা, যা বীরের জন্য পাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
  • কীর্তি ও সম্মানের হানি: অর্জুন এ যাবৎকাল অধর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যে প্রভূত যশ ও গৌরব অর্জন করেছিলেন, স্বধর্ম ত্যাগ করলে সেই অর্জিত কীর্তি বিনষ্ট হবে।

শ্লোক ৩৪

অকীর্তিং চাপি ভূতানি কথয়িষ্যন্তি তেঽব্যয়াম্ ।
সংভাবিতস্য চাকীর্তির্মরণাদতিরিচ্যতে ॥ ৩৪ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: অকীর্তিম্ — চ — অপি — ভূতানি
  • দ্বিতীয় চরণ: কথয়িষ্যন্তি — তে — অব্যয়াম্
  • তৃতীয় চরণ: সংভাবিতস্য — চ — অকীর্তিঃ
  • চতুর্থ চরণ: মরণাৎ — অতিরিচ্যতে

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'অকীর্তিং চাপি' (অকীর্তিম্ + চ + অপি), 'তেঽব্যয়াম্' (তে + অব্যয়াম্), এবং 'চাকীর্তির্মরণাদতিরিচ্যতে' (চ + অকীর্তিঃ + মরণাৎ + অতিরিচ্যতে) পদগুলোর সন্ধি ও বিসর্গ ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে স্পষ্ট লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: ভূতানি চ = জগতের সকল মানুষও; তে = তোমার; অব্যয়াম্ = চিরস্থায়িনী / অক্ষয়; অকীর্তিম্ অপি = অপযশ বা অখ্যাতিও; কথয়িষ্যন্তি = বলবে / ঘোষণা করবে; সংভাবিতস্য চ = সম্মানিত বা সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যক্তির পক্ষে; অকীর্তিঃ = অপযশ / কলঙ্ক; মরণাৎ = মৃত্যু অপেক্ষা; অতিরিচ্যতে = অধিকতর কষ্টদায়ক / অতিশয় দুঃখকর

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "আর সকল লোক চিরকাল তোমার এই অপযশের কথা ঘোষণা করবে; এবং সম্মানিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যক্তির পক্ষে অখ্যাতি বা অপযশ মৃত্যু অপেক্ষাও অধিক কষ্টদায়ক।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • অপযশের চিরস্থায়িত্ব: আগের ৩৩ নম্বর শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে স্বধর্ম ত্যাগের ফলে পাপ ও সুখ্যাতি হানির কথা বলেছিলেন; এই ৩৪ নম্বর শ্লোকে তিনি সতর্ক করে দেন যে, রণাঙ্গন থেকে পিছিয়ে গেলে অর্জুনের বীরত্বের সুখ্যাতি চিরন্তন অপযশে পরিণত হবে এবং বিশ্বজুড়ে মানুষ যুগ যুগ ধরে সেই কলঙ্কের কথা প্রচার করবে।
  • 'মরণাদতিরিচ্যতে' (মৃত্যুর চেয়েও কটু অপযশ): যে বীর সমাজে পরম শ্রদ্ধেয় ও প্রতিষ্ঠিত, তাঁর পক্ষে অখ্যাতি ও অপযশ সহ্য করা শারীরিক মৃত্যুর চেয়েও বহুগুণ বেশি যন্ত্রণাদায়ক। মৃত্যুর মাধ্যমে কেবল দেহের বিনাশ ঘটে, কিন্তু অপযশ চিরকালের জন্য একজন মহাবীরের মর্যাদা ও আদর্শকে ধূলিসাৎ করে দেয়।
  • বীরত্বের মর্যাদা রক্ষা: শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বোঝান যে, কাপুরুষতার কলঙ্ক মাথায় নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধে বীরের মতো আত্মত্যাগ করাও একজন ক্ষত্রিয় যোদ্ধার জন্য পরম সম্মানজনক।

শ্লোক ৩৫

ভয়াদ্রণাদুপরতং মংস্যন্তে ত্বাং মহারথাঃ ।
যেষাং চ ত্বং বহুমতো ভূত্বা যাস্যসি লাঘবম্ ॥ ৩৫ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: ভয়াৎ — রণাৎ — উপরতম্
  • দ্বিতীয় চরণ: মংস্যন্তে — ত্বাম্ — মহারথাঃ
  • তৃতীয় চরণ: যেষাম্ — চ — ত্বম্ — বহুমতঃ — ভূত্বা
  • চতুর্থ চরণ: যাস্যসি — লাঘবম্

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'ভয়াদ্রণাদুপরতং' (ভয়াৎ + রণাৎ + উপরতম্) পদগুলোর সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে স্পষ্ট লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: মহারথাঃ = দুর্যোধনাদি মহারথীগণ; ত্বাম্ = তোমাকে; ভয়াৎ = ভয়ের কারণে / ভয়বশত; রণাৎ = যুদ্ধ থেকে; উপরতম্ = বিরত বা নিবৃত্ত; মংস্যন্তে = মনে করবে বা গণনা করবে; চ = এবং; যেষাম্ = যাঁদের কাছে; ত্বম্ = তুমি; বহুমতঃ ভূত্বা = অত্যন্ত সম্মানিত বা পূজনীয় হয়ে; যাস্যসি = পরিণত হবে / প্রাপ্ত হবে; লাঘবম্ = লঘুতা, অনাদর বা হেয় প্রতিপন্ন হওয়া

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "যে মহারথগণ তোমাকে এযাবৎ পরম সম্মানিত মনে করতেন, তাঁরা মনে করবেন যে তুমি কেবল ভয়ের কারণেই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বিরত হয়েছ; আর তাঁদের দৃষ্টিতেই তুমি অত্যন্ত লঘু ও অশ্রদ্ধার পাত্র হয়ে পড়বে।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক বাস্তবতা: অর্জুন মনে করেছিলেন যে স্বজনদের প্রতি দয়া ও করুণার কারণে তিনি যুদ্ধ ত্যাগ করছেন। কিন্তু সমাজ ও শত্রুপক্ষের কৌরব মহারথীগণ (যেমন দুর্যোধন, কর্ণ প্রমুখ) অর্জুনের এই করুণাকে বীরত্ব বা মহত্ত্ব বলে মনে করবেন না; তাঁরা ভাববেন যে অর্জুন মৃত্যুর ভয়েই রণাঙ্গন ছেড়ে পালিয়েছেন।
  • সম্মানহানি ও লঘুতা: কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে অর্জুন ছিলেন এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী মহাবীর, যাঁকে শত্রুরা সদা ভয় ও শ্রদ্ধার চোখে দেখত। স্বধর্ম ত্যাগ করে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে দাঁড়ালে সেই অর্জিত সম্মান এক মুহূর্তে বিলীন হয়ে যাবে এবং প্রতিপক্ষ তাঁকে অত্যন্ত লঘু বা তুচ্ছ জ্ঞান করবে।
  • ক্ষাত্র মর্যাদার রক্ষা: একজন ক্ষত্রিয়ের পক্ষে নিজের ব্যক্তিগত মানসিক আবেগের চেয়ে ক্ষাত্র মর্যাদার অবমাননা অনেক বেশি ক্ষতিকর। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে স্পষ্ট জানান যে করুণার ছদ্মবেশে রণাঙ্গন ত্যাগ করা বস্তুত নিজের সুখ্যাতি ও গৌরবকে ধূলিসাৎ করার শামিল।

শ্লোক ৩৬

অবাচ্যবাদাংশ্চ বহূন্বদিষ্যন্তি তবাহিতাঃ ।
নিন্দন্তস্তব সামর্থ্যং ততো দুঃখতরং নু কিম্ ॥ ৩৬ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: অবাচ্যবাদান্ — চ — বহূন্
  • দ্বিতীয় চরণ: বদিষ্যন্তি — তব — অহিতাঃ
  • তৃতীয় চরণ: নিন্দন্তঃ — তব — সামর্থ্যম্
  • চতুর্থ চরণ: ততঃ — দুঃখতরম্ — নু — কিম্

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'অবাচ্যবাদাংশ্চ' (অবাচ্যবাদান্ + চ), 'বহূন্বদিষ্যন্তি' (বহূন্ + বদিষ্যন্তি) এবং 'নিন্দন্তস্তব' (নিন্দন্তঃ + তব) পদগুলোর সন্ধি ও বিসর্গ ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে স্পষ্ট লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: তব অহিতাঃ = তোমার শত্রুগণ; তব সামর্থ্যম্ = তোমার বীরত্ব বা সামর্থ্যের; নিন্দন্তঃ = নিন্দা বা অবহেলা করে; বহূন্ = বহুবিধ; অবাচ্যবাদান্ চ = অকথ্য বা কটু বাক্যসমূহও; বদিষ্যন্তি = বলবে বা প্রকাশ করবে; নু = হে অর্জুন!; ততঃ = তাহা অপেক্ষা / তার চেয়ে; দুঃখতরম্ = অধিকতর কষ্টদায়ক; কিম্ = আর কী হতে পারে?

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "তোমার শত্রুগণ তোমার সামর্থ্যের নিন্দা করে বহুপ্রকার অকথ্য কটূক্তি করবে; (হে অর্জুন!) একজন মহাবীরের পক্ষে তার চেয়ে অধিক দুঃখজনক আর কী হতে পারে?"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • শত্রুর কটুভাষণ ও মানসিক যন্ত্রণা: আগের শ্লোকগুলোতে শ্রীকৃষ্ণ অপযশ ও লঘুতা প্রাপ্তির কথা বলেছিলেন; এই ৩৬ নম্বর শ্লোকে তিনি স্পষ্ট জানান যে অর্জুন রণাঙ্গন ত্যাগ করলে কৌরব শত্রুগণ তাঁর ধনুর্ধর হিসেবে অর্জিত খ্যাতিকে উপহাস করবে এবং বহু অকথ্য গালি ও কটু বাক্য প্রয়োগ করবে।
  • ক্ষত্রিয় মর্যাদায় আঘাত: শারীরিক ক্ষত বা আঘাতের চেয়েও একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী বীরের সামর্থ্যের ওপর শত্রুপক্ষের অবমাননাকর মন্তব্য শোনা মনস্তাত্ত্বিকভাবে অনেক বেশি পীড়াদায়ক।
  • বাস্তবতার মুখোমুখি করা: অর্জুন শত্রু ও স্বজনদের প্রতি দয়া দেখিয়ে যুদ্ধ ত্যাগ করতে চাইছিলেন, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে মনে করিয়ে দেন যে প্রতিপক্ষ তাঁর এই আবেগকে সম্মান করবে না, বরং অর্জুনের অক্ষমতা ও দুর্বলতা হিসেবে প্রচার করবে। তাই করুণা না দেখিয়ে ক্ষাত্রধর্ম পালনে উদ্যমী হওয়াই শ্রেয়।

শ্লোক ৩৭

হतो বা প্রাপ্স্যসি স্বর্গং জিত্বা বা ভোক্ষ্যসে মহীম্ ।
তস্মাদুত্তিষ্ঠ কৌন্তেয় যুদ্ধায় কৃতনিশ্চয়ঃ ॥ ৩৭ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: হতঃ — বা — প্রাপ্স্যসি — স্বর্গম্
  • দ্বিতীয় চরণ: জিত্বা — বা — ভোক্ষ্যসে — মহীম্
  • তৃতীয় চরণ: তস্মাৎ — উত্তিষ্ঠ — কৌন্তেয়
  • চতুর্থ চরণ: যুদ্ধায় — কৃতনিশ্চয়ঃ

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'তস্মাদুত্তিষ্ঠ' (তস্মাৎ + উত্তিষ্ঠ) এবং 'জিত্বা বা' পদগুলোর সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে স্পষ্ট ও তেজস্বী লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: হতঃ বা = যদি যুদ্ধে নিহত হও; স্বর্গম্ = স্বর্গ; প্রাপ্স্যসি = লাভ করবে; জিত্বা বা = অথবা জয়লাভ করে; মহীম্ = পৃথিবী; ভোক্ষ্যসে = ভোগ করবে; তস্মাৎ = অতএব; কৌন্তেয় = হে কুন্তীপুত্র অর্জুন; যুদ্ধায় = যুদ্ধের জন্য / যুদ্ধার্থে; কৃতনিশ্চয়ঃ = সংকল্পবদ্ধ / দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে; উত্তিষ্ঠ = উত্থিত হও / দাঁড়াও

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "হে কৌন্তেয়! যদি তুমি যুদ্ধে নিহত হও, তবে স্বর্গ লাভ করবে; আর যদি জয়ী হও, তবে পৃথিবী ভোগ করবে। অতএব যুদ্ধের জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে উত্থিত হও।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • উভয় সংকটের পরম সমাধান (উভয়তঃ লাভ): শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বুঝিয়ে দেন যে ধর্মযুদ্ধে লিপ্ত হলে পরিণাম যাই হোক না কেন, ক্ষত্রিয়ের কোনো পরাজয় বা ক্ষতি নেই। রণাঙ্গনে মৃত্যুবরণ করলে বীরগতি লাভ করে স্বর্গে গমন নিশ্চিত, আর জয়লাভ করলে পৃথিবীর নিষ্কণ্টক রাজ্য ভোগ সম্ভব।
  • 'কৃতনিশ্চয়ঃ' (সংকল্পের দৃঢ়তা): দ্বিধা, সংশয় ও মানসিক ব্যাকুলতা ত্যাগ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে 'কৃতনিশ্চয়' বা দৃঢ়সংকল্প হতে নির্দেশ দিচ্ছেন।
  • কর্মকান্ডের শেষ ও পরবর্তী নিষ্কাম কর্মযোগের সেতু: এই শ্লোকের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ স্বধর্ম পালনের লৌকিক ও পারত্রিক লাভ প্রদর্শন শেষ করছেন, যা এর পরের ৩৮ নম্বর শ্লোক থেকে নিষ্কাম কর্মযোগ বা 'সমত্ব বুদ্ধির' পরম শিক্ষায় উন্নীত হবে।

শ্লোক ৩৮

সুখদুঃখে সমে কৃত্বা লাভালাভৌ জয়াজয়ৌ ।
ততো যুদ্ধায় যুজ্যস্ব নৈবং পাপমবাপ্স্যসি ॥ ৩৮ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: সুখদুঃখে — সমে — কৃত্বা
  • দ্বিতীয় চরণ: লাভালাভৌ — জয়াজয়ৌ
  • তৃতীয় চরণ: ততঃ — যুদ্ধায় — যুজ্যস্ব
  • চাতুর্থ চরণ: ন — এবম্ — পাপম্ — অবাপ্স্যসি

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'লাভালাভৌ' (লাভ + অলাভৌ), 'জয়াজয়ৌ' (জয় + অজয়ৌ), এবং 'নৈবং' (ন + এবম্) পদগুলোর সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে শান্ত ও গম্ভীর লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: সুখদুঃখে = সুখ এবং দুঃখকে; সমে কৃত্বা = সমান জ্ঞান করিয়া / তুল্য দৃষ্টিতে দেখিয়া; লাভালাভৌ = লাভ ও ক্ষতি / অলাভকে; জয়াজয়ৌ = জয় ও পরাজয়কে; ততঃ = তৎপরে / অতঃপর; যুদ্ধায় = যুদ্ধার্থে / কর্তব্যের জন্য; যুজ্যস্ব = প্রবৃত্ত হও / মনোযোগী হও; ন = না; এবম্ = এইরূপে / প্রকারে; পাপম্ = পাপ বা বন্ধন; অবাপ্স্যসি = প্রাপ্ত হইবে / লাভ করবে

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "সুখ ও দুঃখ, লাভ ও অলাভ এবং জয় ও পরাজয়কে সমান জ্ঞান করে (তুল্য দৃষ্টিতে দেখে) যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত বা প্রবৃত্ত হও; এইরূপে স্বধর্ম পালন করলে তুমি পাপভাগী হবে না।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • সমত্ব বুদ্ধির পরম শিক্ষা: পার্থিব জগতে সুখ-দুঃখ, লাভ-ক্ষতি, কিংবা জয়-পরাজয় হলো প্রাকৃত মন ও ইন্দ্রিয়ের দ্বৈত মানসিক প্রতিক্রিয়া। যিনি এই দ্বৈত ভাবের ঊর্ধ্বে উঠে মনকে সমভাবাপন্ন রেখে নিজের কর্তব্য পালন করেন, তিনিই প্রকৃত অর্থে প্রজ্ঞাবান।
  • পাপের প্রকৃত কারণ ও মুক্তি: অর্জুন স্বজনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাকে পাপাচারের মূল বলে মনে করছিলেন। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ স্পষ্ট করেন যে, যুদ্ধ বা কর্ম নিজে পাপের কারণ নয়; বরং কর্মের ফলের প্রতি আসক্তি, জয়-পরাজয়ের মোহ এবং ব্যক্তিগত কামনাই মানুষকে পাপগ্রস্ত করে। অনাসক্ত হয়ে ঈশ্বরার্পিত বুদ্ধিতে স্বধর্ম পালন করলে কোনো পাপ বা কর্মবন্ধন স্পর্শ করতে পারে না।
  • নিষ্কাম কর্মযোগের ভিত্তিস্থাপন: এই শ্লোকটির মাধ্যমে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে সাংখ্য বা তাত্ত্বিক জ্ঞান থেকে সরাসরি ব্যবহারিক 'নিষ্কাম কর্মযোগ'-এর পথে চালিত করলেন।

শ্লোক ৩৯

এষা তেঽভিহিতা সাংখ্যে বুদ্ধির্যোগে ত্বিমাং শৃণু ।
বুদ্ধ্যা যুক্তো যয়া পার্থ কর্মবন্ধং প্রহাস্যসি ॥ ৩৯ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: এষা — তে — অভিহিতা — সাংখ্যে
  • দ্বিতীয় চরণ: বুদ্ধিঃ — যোগে — তু — ইমাম্ — শৃণু
  • তৃতীয় চরণ: বুদ্ধ্যা — যুক্তঃ — যয়া — পার্থ
  • চতুর্থ চরণ: কর্মবন্ধম্ — প্রহাস্যসি

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'তেঽভিহিতা' (তে + অভিহিতা), 'ত্বিমাং' (তু + ইমাম্), এবং 'কর্মবন্ধং' (কর্মবন্ধম্) পদগুলোর সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে স্পষ্ট ও গম্ভীর লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: পার্থ = হে কুন্তীপুত্র অর্জুন; এষা = এই; তে = তোমাকে; অভিহিতা = বললাম / কহিলাম; সাংখ্যে = আত্মতত্ত্ব বা সাংখ্যজ্ঞান বিষয়ে; বুদ্ধিঃ = তত্ত্বজ্ঞান বা বুদ্ধি; যোগে তু = কর্মযোগ বা বুদ্ধিযোগের বিষয়ে কিন্তু; ইমাম্ = এই বুদ্ধির কথা; শৃণু = শোনো / শ্রবণ করো; যয়া = যে বুদ্ধি দ্বারা; বুদ্ধ্যা = বুদ্ধি বা জ্ঞান দ্বারা; যুক্তঃ = যুক্ত হয়ে; কর্মবন্ধম্ = কর্মের বন্ধনরূপ সংসারকে; প্রহাস্যসি = সম্পূর্ণ পরিত্যাগ বা ছেদন করতে পারবে

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "হে পার্থ! আত্মতত্ত্ব বা সাংখ্য বিষয়িণী যে তত্ত্ববুদ্ধির কথা তোমাকে বললাম, তা তো শুনলে; এখন নিষ্কাম কর্মযোগ বা বুদ্ধিযোগ বিষয়িণী জ্ঞান শ্রবণ করো, যে বুদ্ধি বা জ্ঞানের দ্বারা যুক্ত হলে তুমি কর্মের বন্ধন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পারবে।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • জ্ঞানযোগ থেকে কর্মযোগের মহাসন্ধিক্ষণ: দ্বিতীয় অধ্যায়ের ১১ থেকে ৩০ নম্বর শ্লোক পর্যন্ত শ্রীকৃষ্ণ আত্মার শাশ্বত রূপ ও তত্ত্বজ্ঞান (সাংখ্য) বর্ণনা করেছেন। ৩৯ নম্বর শ্লোকটিতে তিনি সেই আত্মজ্ঞানকে বাস্তবে প্রয়োগ করার উপায় হিসেবে 'নিষ্কাম কর্মযোগ' বা 'বুদ্ধিযোগ'-এর দ্বার উন্মোচন করছেন।
  • 'কর্মবন্ধ প্রহাস্যসি' (কর্মবন্ধন মুক্তি): সাধারণ মানুষ ফলের আসক্তিতে কাজ করে কর্মবন্ধনে আবদ্ধ হয়। কিন্তু কর্মফল ত্যাগ করে ঈশ্বরাশ্রিত বুদ্ধিতে কাজ করলে কর্ম আর বন্ধনের কারণ হয় না, বরং মুক্তির পথ সুগম করে।
  • বুদ্ধিযোগের সর্বাত্মক রূপ: বুদ্ধিযোগ মূলতঃ একটিই — যখন তা কর্মের সীমার মধ্যে থাকে তখন তা 'কর্মযোগ', জ্ঞানের সীমায় উন্নীত হলে 'সাংখ্যযোগ', আর প্রেম বা ভক্তিতে স্পর্শ করলে তা পূর্ণাঙ্গ বুদ্ধিযোগে বা ভক্তিযোগে পরিণত হয়।

শ্লোক ৪০

নেহাভিক্রমনাশোঽস্তি প্রত্যবায়ো ন বিদ্যते ।
স্বল্পমপ্যস্য ধর্মস্য ত্রায়তে মহতো ভয়াৎ ॥ ৪০ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: ন — ইহ — অভিক্রমনাশঃ — অস্তি
  • দ্বিতীয় চরণ: প্রত্যবায়ঃ — ন — বিদ্যতে
  • তৃতীয় চরণ: স্বল্পম্ — অপি — অস্য — ধর্মস্য
  • চতুর্থ চরণ: ত্রায়তে — মহতঃ — ভয়াৎ

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'নেহাভিক্রমনাশোঽস্তি' (ন + ইহ + অভিক্রমনাশঃ + অস্তি) এবং 'স্বল্পমপ্যস্য' (স্বল্পম্ + অপি + অস্য) পদগুলোর সন্ধি ও বিসর্গ ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে শান্ত ও নিবিষ্ট লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: ন ইহ = এই নিষ্কাম কর্মযোগে (বা বুদ্ধিযোগে) নেই; অভিক্রমনাশঃ = সুপ্রচেষ্টার নাশ বা বিফল হওয়া; অস্তি = আছে; প্রত্যবায়ঃ = কোনো দোষ, পাপ বা বিপরীত ফল; ন বিদ্যতে = বিদ্যমান নেই; স্বল্পম্ অপি = কিঞ্চিৎমাত্র / সামান্য পরিমাণও; অস্য ধর্মস্য = এই নিষ্কাম কর্মরূপ ধর্মের; ত্রায়তে = পরিত্রাণ করে / রক্ষা করে; মহতঃ ভয়াৎ = সংসাররূপ পরম ভয় (জন্ম-মৃত্যুর চক্র) থেকে

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "এই নিষ্কাম কর্মযোগে (বা বুদ্ধিযোগে) সুপ্রচেষ্টার কোনো বিনাশ বা বিফলতা নেই, এতে কোনো দোষ বা বিপরীত ফল লাভও ঘটে না। এই ধর্মের সামান্যমাত্র অনুষ্ঠানও পরম ভয় (সংসার বা জন্ম-মৃত্যুর ভয়) থেকে পরিত্রাণ করে।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • সকাম ও নিষ্কাম কর্মের মৌলিক পার্থক্য: সকাম কর্মে (যেমন যজ্ঞ বা কাম্য অনুষ্ঠান) সামান্য ভুলত্রুটি হলে পাপ বা বিপরীত প্রতিক্রিয়া ঘটে এবং অসম্পূর্ণ থাকলে পুরো পরিশ্রমই বিফল হয়। কিন্তু নিষ্কাম কর্মযোগে ঈশ্বরার্পিত চিত্তে সুপ্রচেষ্টা শুরু করলে তার সামান্যতম অংশও কখনো বিনষ্ট হয় না, বরং সাধকের হৃদয়ে শুভ সংস্কার হিসেবে অক্ষয় থাকে।
  • অক্ষয় ফলের পরম নিশ্চয়তা: বৈষয়িক বা লৌকিক কাজের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত সব চেষ্টাই বৃথা মনে হয়। কিন্তু ভক্তিযুক্ত নিষ্কাম কর্মে সামান্য অগ্রগতিও সাধককে মোক্ষের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
  • 'মহতো ভয়াৎ' (মহাভয় থেকে মুক্তি): জন্ম-মৃত্যু, জরা, ব্যাধি ও পুনরাবৃত্তিসঙ্কুল সংসারই হলো জীবের সবচেয়ে বড় ভয়। নিষ্কাম কর্মের অনুসারী পরমেশ্বরের শরণ নিয়ে এই পরম ভয় কাটিয়ে নিঃশঙ্ক ও পরম শান্তি লাভ করতে সক্ষম হন।

শ্লোক ৪১

ব্যবসায়াত্মিকা বুদ্ধিরেকেহ কুরুনন্দন ।
বহুশাখা হ্যনংতাশ্চ বুদ্ধয়োঽব্যবসায়িনাম্ ॥ ৪১ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: ব্যবসায়াত্মিকা — বুদ্ধিঃ — একা — ইহ
  • দ্বিতীয় চরণ: কুরুনন্দন
  • তৃতীয় চরণ: বহুশাখাঃ — হি — অনন্তাঃ — চ
  • চতুর্থ চরণ: বুদ্ধয়ঃ — অব্যবসায়িনাম্

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'বুদ্ধিরেকেহ' (বুদ্ধিঃ + একা + ইহ), 'হ্যনংতাশ্চ' (হি + অনন্তাঃ + চ), এবং 'বুদ্ধয়োঽব্যবসায়িনাম্' (বুদ্ধয়ঃ + অব্যবসায়িনাম্) পদগুলোর বিসর্গ ও সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে স্পষ্ট লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: কুরুনন্দন = হে কুরুবংশধর অর্জুন; ইহ = এই নিষ্কাম কর্মযোগে বা ভক্তিযোগের বিষয়ে; ব্যবসায়াত্মিকা = নিশ্চয়াত্মিকা / একনিষ্ঠ / দৃঢ়সংকল্পযুক্ত; বুদ্ধিঃ = বুদ্ধি বা সিদ্ধান্তমূলক প্রজ্ঞা; একা = একটি মাত্র / একমুখী; হি = সুনিশ্চিতভাবে / কারণ; অব্যবসায়িনাম্ = একনিষ্ঠতাহীন কামী ব্যক্তিগণের; বুদ্ধয়ঃ = বুদ্ধিসমূহ / বিবিধ চিন্তাধারা; বহুশাখাঃ = বহু শাখাবিশিষ্ট / বিভক্ত; অনন্তাশ্চ = এবং সীমাহীন বা অসংখ্য

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "হে কুরুনন্দন (অর্জুন)! এই নিষ্কাম কর্মযোগ বা ভক্তিযোগে নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধি একটিই (অর্থাৎ একমুখী ও একনিষ্ঠ); কিন্তু একনিষ্ঠতাহীন কামনাসক্ত ব্যক্তিগণের বুদ্ধি বহু শাখাযুক্ত এবং অসংখ্য কামনা-লক্ষিণী।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধি (একমুখী লক্ষ্য): নিষ্কাম কর্মযোগী বা পরমার্থসাধকের লক্ষ্য কেবল একটিই — তা হলো ঈশ্বরের প্রীতিসাধন ও পরমপদ লাভ। তাই তাঁর মন ও বুদ্ধি বিভ্রান্ত হয় না, বরং পরমেশ্বরে একনিষ্ঠ ও দৃঢ় থাকে।
  • অব্যবসায়ীদের বিক্ষিপ্ত বুদ্ধি: যাঁদের হৃদয়ে নানা প্রকার জাগতিক ভোগ ও কাম্যকর্মের আসক্তি থাকে, তাঁদের চিন্তা ও কামনা অসংখ্য ধারায় ছড়িয়ে পড়ে। ফলে তাঁদের বুদ্ধি স্থির হতে পারে না এবং তা বহু শাখায় বিভক্ত হয়ে পড়ে।
  • সাধনার সাফল্য ও মন একাগ্রতা: শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে অর্জিত আত্মজ্ঞান ও নিষ্কাম ভাবনার মাধ্যমে মনকে একমুখী করার পরামর্শ দিচ্ছেন, যাতে কর্মফল বা সাংসারিক মোহ বুদ্ধিকে বিভ্রান্ত করতে না পারে।

শ্লোক ৪২

যামিমাং পুষ্পিতাং বাচং প্রবদন্ত্যবিপশ্চিতঃ ।
বেদবাদরতাঃ পার্থ নান্যদস্তীতি বাদিনঃ ॥ ৪২ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: যাম্ — ইমাম্ — পুষ্পিতাম্ — বাচম্
  • দ্বিতীয় চরণ: প্রবদন্তি — অবিপশ্চিতঃ
  • তৃতীয় চরণ: বেদবাদরতাঃ — পার্থ
  • চতুর্থ চরণ: ন — অন্যৎ — অস্তি — ইতি — বাদিনঃ

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'প্রবদন্ত্যবিপশ্চিতঃ' (প্রবদন্তি + অবিপশ্চিতঃ) এবং 'নান্যদস্তীতি' (ন + অন্যৎ + অস্তি + ইতি) পদগুলোর সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে স্পষ্ট লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: পার্থ = হে কুন্তীপুত্র অর্জুন; অবিপশ্চিতঃ = মূঢ়, অজ্ঞ বা অনভিজ্ঞ ব্যক্তিগণ; বেদবাদরতাঃ = বেদের কর্মকাণ্ডীয় অর্থবাদ বা কামী বাক্যে আসক্ত; ন অন্যৎ অস্তি ইতি বাদিনঃ = 'পশু, পুত্র, স্বর্গ ছাড়া ঈশ্বর বা পরমার্থ বলে আর কিছুই নেই' — এইরূপ উক্তিকারী; যাম্ ইমাম্ = যে সকল; পুষ্পিতাম্ = পুষ্পিত / আপাত-রমণীয় বা প্রলোভনময়; বাচম্ = বাক্য বা কথা; প্রবদন্তি = বলে থাকে বা প্রচার করে

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "হে পার্থ! বিবেকহীন মূঢ় ব্যক্তিগণ, যারা বেদের কেবল কাম্যকর্মকান্ডীয় বাক্য বা অর্থবাদে আসক্ত এবং ‘ভোগ ও স্বর্গসুখ ব্যতীত অন্য কোনো পরম সত্য নেই’ বলে দাবি করে, তারা যে সকল আপাত-রমণীয় (পুষ্পিত) বাক্য উচ্চারণ করে থাকে..."

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • 'পুষ্পিত বাক্য' (পুষ্পিতা বাচ)-এর তাৎপর্য: বৃক্ষে ফুল ফুটলে তা দেখতে সুন্দর লাগে ও সুবাস ছড়ায়, কিন্তু ফুলই তো শেষ ফল নয়; ফুল থেকে ফল হওয়া মূল লক্ষ্য। একইভাবে বেদের কর্মকাণ্ডে বর্ণিত পুত্র, ধন, স্বর্গলাভ ও বৈভব প্রাপ্তির কথাগুলো শুনতে অত্যন্ত শ্রুতিমধুর ও প্রলোভনময় হলেও তা কেবল প্রাথমিক কুঁড়ি মাত্র; বেদের প্রকৃত শেষ ফল হলো আত্মজ্ঞান ও পরমেশ্বর-ভক্তি।
  • বেদবাদরতদের সীমাবদ্ধতা: কামনাসক্ত ব্যক্তিরা বেদের পরমার্থ বা মোক্ষরূপ মুখ্য তাৎপর্য অনুধাবন না করে কেবল পার্থিব ও স্বর্গীয় সুখলাভের যজ্ঞাদিতে ডুবে থাকে। তারা মনে করে বৈদিক আচার অনুষ্ঠান করে স্বর্গলাভ করাই জীবনের পরম উদ্দেশ্য, এর বাইরে ঈশ্বর বা মুক্তিসাধনা বলতে কিছুই নেই।
  • একাগ্র বুদ্ধির অন্তরায়: ৪১ নম্বর শ্লোকে কৃষ্ণ যে 'নিশ্চয়াত্মিকা' বা একমুখী বুদ্ধির কথা বলেছেন, এই প্রকার আপাত-রমণীয় বাক্যের প্রতি অন্ধ আকর্ষণ সাধকের মনকে বহুধাবিভক্ত করে দেয় এবং ঈশ্বরীয় সমাধিতে স্থির হতে দেয় না।

শ্লোক ৪৩

কামাত্মানঃ স্বর্গপরা জন্মকর্মফলপ্রদাম্ ।
ক্রিয়াবিশেষবহুলাং ভোগৈশ্বর্যগতিং প্রতি ॥ ৪৩ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: কামাত্মানঃ — স্বর্গপরাঃ — জন্মকর্মফলপ্রদাম্
  • দ্বিতীয় চরণ: ক্রিয়াবিশেষবহুলাম্ — ভোগৈশ্বর্যগতিম্ — প্রতি

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'কামাত্মানঃ স্বর্গপরা' (কামাত্মানঃ + স্বর্গপরাঃ) এবং 'ভোগৈশ্বর্যগতিং প্রতি' (ভোগৈশ্বর্যগতিম্ + প্রতি) পদগুলোর বিসর্গ ও অনুস্বার স্পষ্ট ও গম্ভীর লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: কামাত্মানঃ = কামনাসক্ত বা কামাকুলিত চিত্ত ব্যক্তিগণ; স্বর্গপরাঃ = স্বর্গকেই পরম পুরুষার্থ বা শ্রেষ্ঠ উদ্দেশ্য জ্ঞানকারী; জন্মকর্মফলপ্রদাম্ = জন্ম ও কর্মের ভোগরূপ ফল প্রদানকারী (বাক্যকে); ক্রিয়াবিশেষবহুলাম্ = নানাবিধ বৈদিক অনুষ্ঠান ও ক্রিয়া-আচারের বহুলতাযুক্ত; ভোগৈশ্বর্যগতিম্ প্রতি = ভোগ ও ঐশ্বর্য লাভের উদ্দেশ্যে বা সাধক হিসেবে

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "(যারা) কামনাসক্ত এবং স্বর্গভোগকেই পরম পুরুষার্থ বলে মনে করে, (তারা) পুনর্জন্ম ও কর্মফলপ্রদায়ী এবং ভোগ ও ঐশ্বর্য লাভের উপযোগী নানাবিধ জটিল ক্রিয়া-অনুষ্ঠানবহুল (পুষ্পিত) বাক্যসমূহে অনুরক্ত হয়ে থাকে।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • কামনাসক্তদের মানসিকতা ('কামাত্মানঃ' ও 'স্বর্গপরাঃ'): ৪২ নম্বর শ্লোকের পর এই শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ বোঝাচ্ছেন যে, যারা বেদের কেবল অর্থবাদে আসক্ত, তাদের হৃদয় নানা ভোগবাসনায় পূর্ণ থাকে। তারা মোক্ষ বা ঈশ্বরপ্রাপ্তিকে লক্ষ্য না করে কেবল স্বর্গসুখ ও বৈষয়িক সমৃদ্ধি লাভকেই জীবনের পরম লক্ষ্য মনে করে।
  • 'জন্মকর্মফলপ্রদাম্' (কর্মবন্ধনে আবদ্ধতা): সাধ্য ও সাধন বিচারে কর্মকাণ্ডীয় যজ্ঞাদিতে যে শুভ ফল পাওয়া যায়, তা ক্ষণস্থায়ী। এজাতীয় কাজ শেষ পর্যন্ত আত্মজ্ঞান বা মুক্তি প্রদান করতে পারে না; বরং তা মানুষকে পুনরায় জন্ম-মৃত্যুর চক্রে এবং কর্মফলে আবদ্ধ করে ফেলে।
  • 'ক্রিয়াবিশেষবহুলাম্' (অনুষ্ঠানের জটিলতা): কামনাসক্ত সাধকেরা ঈশ্বরমুখী না হয়ে বাহ্যিক নানাবিধ আচার-অনুষ্ঠান, যজ্ঞ ও আড়ম্বরের জটিলতায় নিজেদের মনকে ব্যস্ত রাখে। ফলে তাদের মন আত্মতত্ত্ব বা পরমেশ্বরে স্থির হওয়ার সুযোগ পায় না।

শ্লোক ৪৪

ভোগৈশ্বর্যপ্রসক্তানাং তয়াপহৃতচেতসাম্ ।
ব্যবসায়াত্মিকা বুদ্ধিঃ সমাধৌ ন বিধীয়তে ॥ ৪৪ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: ভোগৈশ্বর্যপ্রসক্তানাম্ — তয়া — অপহৃতচেতসাম্
  • দ্বিতীয় চরণ: ব্যবসায়াত্মিকা — বুদ্ধিঃ — সমাধৌ — ন — বিধীয়তে

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'তয়াপহৃতচেতসাম্' (তয়া + অপহৃতচেতসাম্) পদটির সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে স্পষ্ট ও ধীর লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: ভোগৈশ্বর্যপ্রসক্তানাম্ = ভোগ ও ঐশ্বর্যে অত্যন্ত আসক্ত ব্যক্তিগণের; তয়া = সেই (পুষ্পিত বা প্রলোভনময় বৈদিক বাক্য দ্বারা); অপহৃতচেতসাম্ = অপহৃতচিত্ত বা বিমোহিত জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের; ব্যবসায়াত্মিকা = নিশ্চয়াত্মিকা / একনিষ্ঠ / একমুখী; বুদ্ধিঃ = বুদ্ধি বা প্রজ্ঞা; সমাধৌ = পরমেশ্বরে / চিত্তৈকাগ্রে বা সমাধিতে; ন = না; বিধীয়তে = স্থির হয় / একনিষ্ঠতা লাভ করে

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "সেই আপাত-রমণীয় (পুষ্পিত) বাক্যের দ্বারা যাদের চিত্ত বিমোহিত বা অপহৃত হয়েছে এবং যারা ভোগ ও ঐশ্বর্যে অত্যন্ত আসক্ত, তাদের নিশ্চয়াত্মিকা (একমুখী) বুদ্ধি পরমেশ্বরে বা সমাধিতে কখনোই স্থির হয় না।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • ভোগ ও ঐশ্বর্যে আসক্তির পরিণতি: আগের ৪২ ও ৪৩ নম্বর শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ যাদের বেদের অর্থবাদে আসক্ত কামী ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন, এই ৪৪ নম্বর শ্লোকে তাদের পরিণাম প্রকাশ করেছেন। প্রলোভনময় বাক্যে মোহিত হয়ে যারা কেবল পার্থিব সম্পদ ও স্বর্গীয় ভোগ-ঐশ্বর্য লাভের কামনায় নিমগ্ন থাকে, তাদের মন চরম চঞ্চল হয়ে পড়ে।
  • 'সমাধৌ ন বিধীয়তে' (সমাধিতে স্থির না হওয়া): 'সমাধি' অর্থাৎ পরমেশ্বরে বা পরম সত্যে মনের সম্পূর্ণ নিশ্চল ও একাগ্ৰ স্থিতি। ভোগস্পৃহায় আচ্ছন্ন ব্যক্তিদের বুদ্ধি নিত্য-অনিত্য বিচারে অক্ষম হওয়ায় একনিষ্ঠভাবে ভগবানে স্থির হতে পারে না।
  • নিষ্কাম ভাবনার প্রয়োজনীয়তা: শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে ভোগাসক্তি দূর করে মনকে ঈশ্বরাশ্রিত ও একমুখী করার উপদেশ দিচ্ছেন, যাতে সাধকের বুদ্ধি 'ব্যবসায়াত্মিকা' হয়ে পরম শান্তিতে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

শ্লোক ৪৫

ত্রৈগুণ্যবিষয়া বেদা নিস্ত্রৈগুণ্যো ভবার্জুন ।
নির্দ্বন্দ্বো নিত্যসত্ত্বস্থো নির্যোগক্ষেম আত্মবান্ ॥ ৪৫ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: ত্রৈগুণ্যবিষয়াঃ — বেদাঃ
  • দ্বিতীয় চরণ: নিস্ত্রৈগুণ্যঃ — ভব — অর্জুন
  • তৃতীয় চরণ: নির্দ্বন্দ্বঃ — নিত্যসত্ত্বস্থঃ
  • চতুর্থ চরণ: নির্যোগক্ষেমঃ — আত্মবান্

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'ত্রৈগুণ্যবিষয়া বেদা' (ত্রৈগুণ্যবিষয়াঃ + বেদাঃ), 'নিস্ত্রৈগুণ্যো ভবার্জুন' (নিস্ত্রৈগুণ্যঃ + ভব + অর্জুন), এবং 'নির্যোগক্ষেম আত্মবান্' (নির্যোগক্ষেমঃ + আত্মবান্) পদগুলোর বিসর্গ ও সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে স্পষ্ট ও গভীর লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: অর্জুন = হে অর্জুন!; বেদাঃ = বেদসমূহ / বৈদিক সাংশিক কর্মকাণ্ড; ত্রৈগুণ্যবিষয়াঃ = ত্রিগুণাত্মক (প্রকৃতির সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ গুণঘটিত বা বৈষয়িক বিষয়ভিত্তিক); নিস্ত্রৈগুণ্যঃ = ত্রিগুণাতীত / গুণত্রয়হীন; ভব = হও; নির্দ্বন্দ্বঃ = মান-অপমান, শীতোষ্ণ, সুখ-দুঃখ আদি প্রাকৃত দ্বৈতভাবমুক্ত; নিত্যসত্ত্বস্থঃ = সর্বদা পরমেশ্বরে / বিশুদ্ধ সত্ত্বগুণে অচল স্থিতিবিশিষ্ট; নির্যোগক্ষেমঃ = যোগ (অলব্ধ বস্তু লাভ) ও ক্ষেম (প্রাপ্ত বস্তু রক্ষা)-এর ব্যাকুলতামুক্ত; আত্মবান্ = আত্মনিষ্ঠ / বুদ্ধিযোগযুক্ত বা প্রজ্ঞাবান

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "হে অর্জুন! বেদসমূহ প্রধানত প্রকৃতির তিনটি গুণাত্মক (সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ) বিষয়ের প্রতিপাদক; তুমি এই ত্রিগুণের অতীত (নিস্ত্রৈগুণ্য) হও। দ্বন্দ্বহীন (সুখ-দুঃখ, মান-অপমানের অতীত), নিত্য সত্ত্বগুণে অবস্থিত, যোগ ও ক্ষেমের চিন্তারহিত এবং আত্মনিষ্ঠ হয়ে ওঠো।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • বেদের প্রধান বিষয় ও সীমাবদ্ধতা: বেদের কর্মকাণ্ডে সাধারণত প্রকৃতির তিন গুণ (সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ)-এর অধীনে পার্থিব ও স্বর্গীয় সুখ-ভোগ লাভের উপায় বর্ণিত রয়েছে। প্রাকৃত কামনাসক্ত ব্যক্তিগণ বেদের কেবল এই বৈষয়িক অংশ বা গৌণ অর্থবাদের প্রতিই আকৃষ্ট থাকে; ফলে তারা বেদের পরম লক্ষ্য নির্গুণ তত্ত্ব বুঝতে পারে না।
  • 'নিস্ত্রৈগুণ্য' হওয়ার নির্দেশ: শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে প্রকৃতির তিন গুণের বাধ্যবাধকতা ছাড়িয়ে 'নিস্ত্রৈগুণ্য' বা ত্রিগুণাতীত পরম পরমার্থ ও নিষ্কপটা ভক্তিভাব গ্রহণ করতে নির্দেশ দেন।
  • 'নির্দ্বন্দ্ব' ও 'নিত্যসত্ত্বস্থ': জাগতিক জয়-পরাজয় বা সুখ-দুঃখের রূপান্তর থেকে নিজেকে মুক্ত করে সর্বদাই ঈশ্বরমুখী বিশুদ্ধ সত্ত্বে চিত্তকে স্থির রাখার কথা বলা হয়েছে।
  • 'নির্যোগক্ষেম' ও 'আত্মবান্': অলব্ধ বস্তুর লাভকে 'যোগ' এবং লাভ করা বস্তু রক্ষা করাকে 'ক্ষেম' বলে। এই পার্থিব বস্তু অর্জন ও সুরক্ষার চিন্তা পরিত্যাগ করে পরমেশ্বরের আশ্রয়ে আত্মনিষ্ঠ (বুদ্ধিযোগযুক্ত) হওয়াকেই পরম মোক্ষ লাভের পথ হিসেবে নির্দিষ্ট করা হয়েছে।

শ্লোক ৪৬

যাবানর্থ উদপানে সর্বতঃ সংপ্লুতোদকে ।
তাবান্সর্বেষু বেদেষু ব্রাহ্মণস্য বিজানतः ॥ ৪৬ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: যাবান্ — অর্থঃ — উদপানে
  • দ্বিতীয় চরণ: সর্বতঃ — সংপ্লুতোদকে
  • তৃতীয় চরণ: তাবান্ — সর্বেষু — বেদেষু
  • চতুর্থ চরণ: ব্রাহ্মণস্য — বিজানতঃ

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'যাবানর্থ' (যাবান্ + অর্থঃ) এবং 'সংপ্লুতোদকে' (সংপ্লুত + উদকে) পদগুলোর সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে ধীর ও স্পষ্ট লয়ে উচ্চারণ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: উদপানে = ক্ষুদ্র জলাশয়ে বা কূপে; যাবান্ = যে পরিমাণ / যে যে; অর্থঃ = প্রয়োজন বা উপকারিতা; সর্বতঃ = সর্বদিক থেকে; সংপ্লুতোদকে = চতুর্দিক প্লাবিত সুবৃহৎ জলাশয়ে বা মহাসরোবরে; তাবান্ = সেই সমস্ত প্রয়োজনই; সর্বেষু = সকল; বেদেষু = বেদসমূহে বা বেদোক্ত আচার-অনুষ্ঠানে; বিজানতঃ = সম্যক্ তত্ত্বজ্ঞ বা বেদের প্রকৃত তাৎপর্যজ্ঞ; ব্রাহ্মণস্য = ব্রহ্মজ্ঞ বা পরমার্থদর্শী পুরুষের পক্ষে

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "চতুর্দিকে জলপ্লাবিত সুবৃহৎ জলাশয় বা সরোবর প্রাপ্ত হলে ক্ষুদ্র জলাশয় বা কূপে মানুষের যে প্রয়োজন সিদ্ধ হয়, বেদের মূল তাৎপর্য (পরমাত্মা বা ভগবদ্ভক্তি) বিজানতঃ অর্থাৎ পরমার্থজ্ঞ বা ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষের পক্ষে সকল বেদোক্ত অনুষ্ঠানে ঠিক সেই প্রয়োজনই (এবং ততোধিক পূর্ণতা) সাধিত হয়।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • মহাজলাশয় ও ক্ষুদ্র কূপের রূপক: কোনো গ্রামে একটি ছোট কূপে যে পরিমাণ জল থাকে, তা দিয়ে দৈনন্দিন সামান্য জলপান বা পরিচ্ছন্নের কাজ চলে। কিন্তু মানুষের সামনে যদি চতুর্দিক প্লাবিত বিপুল জলাশয় বা মহাসরোবর বিদ্যমান থাকে, তবে ক্ষুদ্র কূপের সমস্ত প্রয়োজন সেই মহাসরোবরেই অনায়াসে মেটে।
  • বেদের গৌণ ও মুখ্য উদ্দেশ্য: বেদের কর্মকাণ্ডে বর্ণিত বিভিন্ন দেবতারাধনা বা কাম্য অনুষ্ঠান হলো ক্ষুদ্র জলাশয়ের মতো। অন্যদিকে, শ্রীকৃষ্ণের ভজনা ও পরমাত্মতত্ত্বজ্ঞান হলো সেই অপার মহাসরোবর।
  • ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষের দৃষ্টি: যিনি বেদের মূল পরমার্থ বা ঈশ্বরকে জেনেছেন, তাঁর জন্য বেদের ছোটখাটো কাম্য আচারের পৃথক প্রয়োজনীয়তা নিঃশেষ হয়ে যায়; কারণ একমাত্র ভগবদারাধনা ও আত্মজ্ঞানের মধ্যেই বেদের সকল শুভ ফল স্বতঃই অন্তর্ভুক্ত থাকে।

শ্লোক ৪৭

কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন ।
মা কর্মফলহেতুর্ভূর্মা তে সংগোঽস্ত্বকর্মণি ॥ ৪৭ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: কর্মণি — এব — অধিকারঃ — তে
  • দ্বিতীয় চরণ: মা — ফলেষু — কদাচন
  • তৃতীয় চরণ: মা — কর্মফলহেতুঃ — ভূঃ
  • চতুর্থ চরণ: মা — তে — সঙ্গঃ — অস্তু — অকর্মণি

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'কর্মণ্যেবাধিকারস্তে' (কর্মণি + এব + অধিকারঃ + তে) এবং 'সংগোঽস্ত্বকর্মণি' (সঙ্গঃ + অস্তু + অকর্মণি) পদগুলোর সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে ধীর, গম্ভীর ও স্পষ্ট লয়ে উচ্চারণ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: তে = তোমার; কর্মণি এব = কেবল স্বধর্মবিহিত কর্তব্যানুষ্ঠানেই; অধিকারঃ = অধিকার বা একচ্ছত্র অধিকার; কদাচন = কোনো অবস্থাতেই / কখনো; মা ফলেষু = কর্মফলে (বা ফলের আকাঙ্ক্ষায়) যেন না হয়; মা কর্মফলহেতুঃ ভূঃ = কর্মফলের কারণ বা ফলাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তি হইও না; তে = তোমার; অকর্মণি = কর্মহীনতায় / স্বধর্ম অননুষ্ঠানে বা অলসতায়; সঙ্গঃ মা অস্তু = আসক্তি বা প্রবৃত্তি যেন না হয়

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "স্বধর্মবিহিত কর্তব্যানুষ্ঠানেই তোমার অধিকার রয়েছে, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই কর্মফলে (বা ফলের আকাংক্ষায়) অধিকার নেই। তুমি কখনো কর্মফলের হেতু বা কামী হইও না এবং কর্মত্যাগেও (অকর্ম বা অলসতায়) যেন তোমার আসক্তি না হয়।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • নিষ্কাম কর্ম의 চার সুনির্দিষ্ট নীতি: এই একটি শ্লোক থেকেই নিষ্কাম কর্মযোগের চারটি পরম নীতি প্রকাশ পায় —
    • কর্মে অধিকার: মানুষের প্রধান কর্তব্য হলো নিজের ধর্ম ও সামাজিক দায়িত্ব পালন করা।
    • ফলে অনধিকার: কর্মের পরিণাম বা ফল মানুষের একক নিয়ন্ত্রণে থাকে না; তা প্রাকৃত নিয়ম ও ঈশ্বরাধীন।
    • কর্মফলের হেতু না হওয়া: ফলের আশায় কাজ করলে সেই ফলের মোহ মানুষকে কর্মবন্ধনে আবদ্ধ করে, তাই ফলাকাঙ্ক্ষী না হতে উপদেশ দেওয়া হয়েছে।
    • অকর্ম বা কাজ না করার মনোভাব ত্যাগ: ফলের আশা ছাড়তে বলা হয়েছে বলে কাজ করাই বন্ধ করে দেওয়া (অকর্ম) সম্পূর্ণ অনুচিত।
  • মানসিক চাপ ও উদ্বেগ থেকে পরম মুক্তি: মানুষ যখন কোনো কাজের ফলের বিষয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করে, তখন ভয়, শঙ্কা ও মানসিক চঞ্চলতার জন্ম হয়। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে শেখাচ্ছেন যে, ফলাফলের মোহ ত্যাগ করে পূর্ণ মনোযোগ কেবল বর্তমানে নিজের কর্তব্যে স্থাপন করাই হলো মানসিক শান্তির চাবিকাঠি।
  • সংস্কৃতি থেকে কর্মবন্ধন ছেদন: ফলাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে ঈশ্বরার্পিত চিত্তে কাজ করলে কোনো কর্মই আর শুভ-অশুভ বন্ধন তৈরি করতে পারে না; তা সাধককে পরম মুক্তির দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

শ্লোক ৪৮

যোগস্থঃ কুরু কর্মাণি সঙ্গং ত্যক্ত্বা ধনঞ্জয় ।
সিদ্ধ্যসিদ্ধ্যোঃ সমো ভূত্বা সমত্বং যোগ উচ্যতে ॥ ৪৮ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: যোগস্থঃ — কুরু — কর্মাণি
  • দ্বিতীয় চরণ: সঙ্গম্ — ত্যক্ত্বা — ধনঞ্জয়
  • তৃতীয় চরণ: সিদ্ধ্যসিদ্ধ্যোঃ — সমঃ — ভূত্বা
  • চতুর্থ চরণ: সমত্বম্ — যোগঃ — উচ্যতে

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'যোগস্থঃ' পদের বিসর্গ, 'সিদ্ধ্যসিদ্ধ্যোঃ' (সিদ্ধি + অসিদ্ধ্যোঃ) এবং 'সমত্বং যোগ উচ্যতে' (সমত্বম্ + যোগঃ + উচ্যতে) পদগুলোর সন্ধি ও বিসর্গ ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে স্পষ্ট ও গম্ভীর লয়ে উচ্চারণ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: ধনঞ্জয় = হে ধনঞ্জয় (অর্জুন)!; যোগস্থঃ = ভক্তিযোগে / পরমেশ্বরে চিত্ত সমাহিত রেখে; সঙ্গম্ = আসক্তি বা ফলের মোহ; ত্যক্ত্বা = ত্যাগ করে; সিদ্ধ্যসিদ্ধ্যোঃ = কর্মের সাফল্য ও অসাফল্যে / জয় ও পরাজয়ে; সমঃ ভূত্বা = সমভাবাপন্ন বা তুল্যবুদ্ধি হয়ে; কর্মাণি = স্বধর্মবিহিত কর্মসমূহ; কুরু = সম্পাদন করো; সমত্বম্ = চিত্তের সমভাব বা সমবুদ্ধিকেই; যোগঃ = যোগ; উচ্যতে = বলা হয় / কথিত হয়

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "হে ধনঞ্জয়! তুমি আসক্তি (বা ফলকামনা) ত্যাগ করে এবং কর্মের সিদ্ধি ও অসিদ্ধিতে সমভাবাপন্ন হয়ে ভক্তিযোগে অবস্থানপূর্বক স্বধর্মবিহিত কর্ম সম্পাদন করো; কারণ কর্মের সিদ্ধি ও অসিদ্ধিতে এই যে সমবুদ্ধি, তাকেই 'যোগ' বলা হয়।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • 'সমত্বং যোগ উচ্যতে' (যোগের পরম সংজ্ঞা): আগের ৪৭ নম্বর শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ নিষ্কাম কর্মের নীতি প্রকাশ করেছিলেন; এই ৪৮ নম্বর শ্লোকে তিনি গীতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ দর্শন—যোগের মূল সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। জাগতিক লাভ-ক্ষতি, জয়-পরাজয় কিংবা সিদ্ধি-অসিদ্ধিতে চিত্তের যে অবিচলিত সমভাব, তাকেই গীতার দর্শনে 'যোগ' বলা হয়।
  • 'যোগস্থঃ' হয়ে কর্ম সম্পাদনের নির্দেশ: যোগ মানে কেবল আসন বা অঙ্গ সঞ্চালন নয়; পরমেশ্বরে মনকে যুক্ত রেখে (যোগস্থ হয়ে) আসক্তিহীনভাবে নিজ কর্তব্য করে যাওয়াই হলো প্রকৃত যোগ সাধনা।
  • 'সঙ্গং ত্যক্ত্বা' (আসক্তি বর্জন): কাজের সাফল্য বা অসাফল্যের ওপর নিজের সুখ-দুঃখ নির্ভর করতে দেওয়া অনুচিত। কর্তৃত্বের অভিমান ও ফলের মোহ ত্যাগ করে নিষ্কামভাবে কর্ম করলে সাধকের চিত্তে পরম শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।

শ্লোক ৪৯

দূরেণ হ্যবরং কর্ম বুদ্ধিয়োগাদ্ধনংজয় ।
বুদ্ধৌ শরণমন্বিচ্ছ কৃপণাঃ ফলহেতবঃ ॥ ৪৯ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: দূরেণ — হি — অবরম্ — কর্ম
  • দ্বিতীয় চরণ: বুদ্ধিয়োগাৎ — ধনংজয়
  • তৃতীয় চরণ: বুদ্ধৌ — শরণম্ — অন্বিচ্ছ
  • চতুর্থ চরণ: কৃপণাঃ — ফলহেতবঃ

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'হ্যবরং' (হি + অবরম্), 'বুদ্ধিয়োগাদ্ধনংজয়' (বুদ্ধিয়োগাৎ + ধনংজয়) এবং 'শরণমন্বিচ্ছ' (শরণম্ + অন্বিচ্ছ) পদগুলোর সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে স্পষ্ট ও শান্ত লয়ে উচ্চারণ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: ধনংজয় = হে ধনঞ্জয় (অর্জুন)!; হি = যেহেতু; বুদ্ধিয়োগাৎ = সমত্বরূপ নিষ্কাম কর্মযোগ বা বুদ্ধিযোগ অপেক্ষা; কর্ম = সকাম বা কাম্যকর্ম; দূরেণ অবরম্ = বহু দূরে / অত্যন্ত নিকৃষ্ট; বুদ্ধৌ = নিষ্কাম কর্মলক্ষণ যুক্ত বুদ্ধিতে / বুদ্ধিযোগে; শরণম্ অন্বিচ্ছ = আশ্রয় প্রার্থনা বা অন্বেষণ করো; ফলহেতবঃ = ফলাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তিগণ; কৃপণাঃ = কৃপণ বা দীন (আত্যন্তিক অভাবগ্রস্ত)

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "হে ধনঞ্জয়! কাম্যকর্ম (বা সকাম কর্ম) সমত্বরূপ নিষ্কাম বুদ্ধিযোগ অপেক্ষা অত্যন্ত নিকৃষ্ট; অতএব তুমি নিষ্কাম বুদ্ধিযোগের আশ্রয় গ্রহণ করো। কারণ যারা ফলাকাঙ্ক্ষী (ফলের আসক্তিতে কাজ করে), তারা অত্যন্ত কৃপণ বা দীন।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • সকাম কর্মের নিকৃষ্টতা ('দূরেণ হ্যবরং কর্ম'): আগের ৪৭ ও ৪৮ নম্বর শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ নিষ্কাম কর্মের নীতি এবং সিদ্ধি-অসিদ্ধিতে 'সমত্বভাব'-এর মহত্ত্ব ব্যাখ্যা করেছেন। এই ৪৯ নম্বর শ্লোকে তিনি স্পষ্ট জানান যে, ফলের আশায় কৃত সকাম কর্ম নিষ্কাম বুদ্ধিযোগের তুলনায় অত্যন্ত তুচ্ছ ও হেয়। কারণ সকাম কর্ম মানুষকে কর্মফলের জালে জড়িয়ে জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবদ্ধ রাখে।
  • 'কৃপণাঃ ফলহেতবঃ' (ফলাকাঙ্ক্ষীরা কৃপণ): যারা সাময়িক ও ক্ষণস্থায়ী ভোগ-সুখের উদ্দেশ্যে কাজ করে, গীতার দর্শনে তারা 'কৃপণ' বা দীন। পরমাত্মার অপার আনন্দ ও মোক্ষ অর্জনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যারা কেবল পার্থিব ফল কামনায় নিজেদের নিমগ্ন রাখে, তারা আত্মিকভাবে দরিদ্র।
  • 'বুদ্ধৌ শরণমন্বিচ্ছ' (বুদ্ধিযোগের পরম আশ্রয়): শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে কোনো প্রকার ফলাকাঙ্ক্ষা না রেখে সমত্ববুদ্ধিতে ঈশ্বরাশ্রিত হয়ে নিষ্কামভাবে স্বধর্ম পালনের আহ্বান জানান। এই বুদ্ধিযোগই মানুষকে কর্মের বন্ধন থেকে মুক্ত করে পরম শান্তিতে প্রতিষ্ঠিত করে।

শ্লোক ৫০

বুদ্ধিয়ুক্তো জহাতীহ উভে সুকৃতদুষ্কৃতে ।
তস্মাদ্য়োগায় যুজ্যস্ব যোগঃ কর্মসু কৌশলম্ ॥ ৫০ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: বুদ্ধিযুক্তঃ — জহাতি — ইহ
  • দ্বিতীয় চরণ: উভে — সুকৃতদুষ্কৃতে
  • তৃতীয় চরণ: তস্মাৎ — যোগায় — যুজ্যস্ব
  • চতুর্থ চরণ: যোগঃ — কর্মসু — কৌশলম্

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'বুদ্ধিয়ুক্তো' (বুদ্ধিযুক্তঃ), 'জহাতীহ' (জহাতি + ইহ), এবং 'তস্মাদ্য়োগায়' (তস্মাৎ + যোগায়) পদগুলোর বিসর্গ ও সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে স্পষ্ট ও গভীর লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: বুদ্ধিযুক্তঃ = নিষ্কাম সমত্ববুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি; ইহ = এই জন্মেই / এই সংসারে অবস্থানকালেই; উভে = উভয়বিধ; সুকৃতদুষ্কৃতে = পুণ্য ও পাপ উভয় কর্মের ফলকে; জহাতি = পরিত্যাগ করেন / তা থেকে মুক্ত হন; তস্মাৎ = অতএব; যোগায় = নিষ্কাম সমত্বরূপ যোগসাধনার উদ্দেশ্যে; যুজ্যস্ব = সচেষ্ট বা যুক্ত হও / যত্ন করো; যোগঃ = সমত্বরূপ নিষ্কাম বুদ্ধিযোগই; কর্মসু = কর্মসমূহের মধ্যে / কর্মের বন্ধন ছেদনে; কৌশলম্ = পরম কৌশল বা নৈপুণ্য

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "নিষ্কাম সমত্ববুদ্ধিযুক্ত ব্যক্তি এই জন্মেই পুণ্য ও পাপ উভয়বিধ কর্মের ফল পরিত্যাগ করেন (বা তা থেকে মুক্ত হন)। অতএব তুমি নিষ্কাম সমত্বযোগের সাধনায় সচেষ্ট হও; কারণ কর্মের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার এই সমত্ববুদ্ধি বা বুদ্ধিযোগই হলো কর্মের প্রকৃত কৌশল (নৈপুণ্য)।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • 'সুকৃতদুষ্কৃতে' (পাপ ও পুণ্য উভয়েরই ঊর্ধ্বায়ন): সাধারণ দৃষ্টিতে অসৎ বা পাপকর্ম ত্যাগ করে সৎ বা পুণ্যকর্ম অর্জন করাই পরম লক্ষ্য বলে মনে হয়। কিন্তু গভীর তত্ত্ববিচারে, অশুভ কর্ম যেমন লোহার শৃঙ্খল হয়ে জীবকে বাঁধিয়া রাখে, তেমনই ফলাকাঙ্ক্ষাপূর্ণ শুভকর্মও স্বর্ণশৃঙ্খলের মতো স্বর্গাদি ভোগের মাধ্যমে পুনর্জন্মের চক্রে আবদ্ধ করে। সমত্ববুদ্ধিসম্পন্ন নিষ্কাম সাধক এই জন্মেই উভয় প্রকার কর্মফল ত্যাগ করে চিরমুক্তি লাভ করেন।
  • 'যোগঃ কর্মসু কৌশলম্' (কর্মের পরম নৈপুণ্য): ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এখানে নিষ্কাম কর্মের প্রকৃত শৈল্পিক বা মনস্তাত্ত্বিক কৌশলটি শিক্ষা দিয়েছেন। সংসারে কর্ম ত্যাগ করা প্রকৃত বীরত্ব নয়, বরং জগতে অবস্থান করে এবং সর্বপ্রকার কাজ করেও কীভাবে সেই কাজের ফলাফলে আবদ্ধ না থাকা যায় — তা-ই হলো আসল 'কৌশল'। ঈশ্বরের প্রীত্যর্থে আসক্তিহীন হয়ে নিজ কর্তব্য করে যাওয়াই হলো কর্মের পরম নৈপুণ্য।
  • জীবনমুক্তি ও মানসিক শান্তি: এই সমত্ববুদ্ধি সাধককে জীবদ্দশাতেই সমস্ত দ্বৈতভাব, উদ্বেগ ও কর্মের বন্ধন থেকে মুক্ত করে পরম শান্তিতে প্রতিষ্ঠিত করে।

শ্লোক ৫১

কর্মজং বুদ্ধিয়ুক্তা হি ফলং ত্যক্ত্বা মনীষিণঃ ।
জন্মবন্ধবিনির্মুক্তাঃ পদং গচ্ছন্ত্যনাময়ম্ ॥ ৫১ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: কর্মজম্ — বুদ্ধিযুক্তাঃ — হি
  • দ্বিতীয় চরণ: ফলম্ — ত্যক্ত্বা — মনীষিণঃ
  • তৃতীয় চরণ: জন্মবন্ধবিনির্মুক্তাঃ
  • চতুর্থ চরণ: পদম্ — গচ্ছন্তি — অনাময়ম্

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'কর্মজং' (কর্মজম্), এবং 'গচ্ছন্ত্যনাময়ম্' (গচ্ছন্তি + অনাময়ম্) পদগুলোর সন্ধি ও অনুস্বার ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে স্পষ্ট ও শান্ত লয়ে উচ্চারণ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: হি = যেহেতু; বুদ্ধিযুক্তাঃ = সমত্ববুদ্ধি বা নিষ্কাম বুদ্ধিবিশিষ্ট; মনীষিণঃ = মনীষিগণ বা প্রজ্ঞাবান তত্ত্বজ্ঞানিগণ; কর্মজম্ = কর্মজাত / কর্ম থেকে উৎপন্ন; ফলম্ = ফলকে (ফলাকাঙ্ক্ষাকে); ত্যক্ত্বা = ত্যাগ করে; জন্মবন্ধবিনির্মুক্তাঃ = জন্মরূপ বন্ধন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে; অনাময়ম্ = সর্বোপদ্রবরহিত / দুঃখ-শোকহীন পরম অবস্থা; পদম্ = পরমপদ বা পরাশান্তি; গচ্ছন্তি = লাভ করেন / গমন করেন

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "যেহেতু সমত্ববুদ্ধিযুক্ত প্রজ্ঞাবান মনীষিগণ কর্মজাত ফল ত্যাগ করে জন্মরূপ বন্ধন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হন এবং সর্বোপদ্রবরহিত পরমপদ (পরাশান্তি বা মোক্ষ) লাভ করেন।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • কর্মফল ত্যাগের পরম সার্থকতা: আগের ৫০ নম্বর শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ বলেছিলেন যে সমত্ববুদ্ধিই হলো কর্মের প্রকৃত কৌশল। এই ৫১ নম্বর শ্লোকে তিনি সেই নিষ্কাম বুদ্ধিযুক্ত মনীষীদের চূড়ান্ত আধ্যাত্মিক অর্জনের কথা তুলে ধরেছেন। কর্ম নিজে মানুষকে জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবদ্ধ করে না; বরং কর্মের ফলের প্রতি যে আসক্তি থাকে, তা-ই জীবকে বারবার সংসারে টেনে আনে। নিষ্কাম সাধক কর্মফল ত্যাগ করে সেই কর্মজনিত বন্ধন ছেদন করতে সমর্থ হন।
  • 'জন্মবন্ধবিনির্মুক্তাঃ' (সংসার-বন্ধন থেকে পরম মুক্তি): প্রাকৃত জগতে সাধারণ কাম্য কর্ম মানুষকে কর্মফলের শৃঙ্খলে বেঁধে রাখে। কিন্তু ঈশ্বরার্পিত চিত্তে সমত্ববুদ্ধির মাধ্যমে কাজ করলে সাধক জন্ম-মৃত্যুর অশেষ ঘূর্ণাবর্ত বা বন্ধন থেকে চিরতরে বিনির্মুক্ত হন।
  • 'পদমনাময়ম্' (সর্বোপদ্রবরহিত ধাম): প্রাকৃত জগতের দুঃখ, জরা, ব্যাধি, শোক ও বিপর্যয়কে বৈদিক পরিভাষায় 'আময়' (রোগ বা উপদ্রব) বলা হয়। এই সব প্রকার অশুভ বা তাপ থেকে মুক্ত পরমপদ লাভ করাই হলো জীবাত্মার চরম লক্ষ্য।

শ্লোক ৫২

যদা তে মোহকলিলং বুদ্ধির্ব্যতিতরিষ্যতি ।
তদা গন্তাসি নির্বেদং শ্রোতব্যস্য শ্রুতস্য চ ॥ ৫২ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: যদা — তে — মোহকলিলম্
  • দ্বিতীয় চরণ: বুদ্ধিঃ — ব্যতিতরিষ্যতি
  • তৃতীয় চরণ: তদা — গন্তাসি — নির্বেদম্
  • চতুর্থ চরণ: শ্রোতব্যস্য — শ্রুতস্য — চ

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'মোহকলিলং' (মোহকলিলম্) এবং 'বুদ্ধির্ব্যতিতরিষ্যতি' (বুদ্ধিঃ + ব্যতিতরিষ্যতি) পদগুলোর বিসর্গ ও অনুস্বার স্পষ্ট করে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে গম্ভীর ও নিবিষ্ট লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: যদা = যখন; তে = তোমার; বুদ্ধিঃ = অন্তঃকরণ / বুদ্ধি; মোহকলিলম্ = দেহাত্মবোধ ও অবিদ্যাজনিত দুর্গম মোহপঙ্ক / গহন জঙ্গল; ব্যতিতরিষ্যতি = সম্পূর্ণরূপে অতিক্রম করবে; তদা = তখন; শ্রুতস্য চ = পূর্বে যা শ্রুত হয়েছে এবং; শ্রোতব্যস্য = ভবিষ্যতে যা শ্রবণযোগ্য; নির্বেদম্ = বৈরাগ্য বা উদাসীনতা; গন্তাসি = প্রাপ্ত হবে / লাভ করবে

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "যখন তোমার বুদ্ধি দেহাত্মবোধ ও অবিদ্যাজনিত মোহরূপ দুর্গম গহনকে (জঙ্গলকে) সম্পূর্ণরূপে অতিক্রম করবে, তখন তুমি পূর্বে শ্রুত এবং ভবিষ্যতে শ্রবণযোগ্য ভোগাসক্তিসংক্রান্ত সকল বিষয়ে পরম বৈরাগ্য লাভ করবে।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • 'মোহকলিলম্' (মোহের দুর্গম জঙ্গল অতিক্রম): 'কলিল' শব্দের অর্থ দুর্গম অরণ্য বা পঙ্কিলতা। সাধারণ মানুষের বুদ্ধি দেহাসক্তি, স্বজনপ্রীতি ও সংসারের মায়ায় অন্ধ হয়ে মোহরূপ জঙ্গলে পথ হারিয়ে ফেলে। সমত্ববুদ্ধি ও নিষ্কাম কর্মযোগের সাধনায় সিদ্ধি লাভ করলে সাধকের বিবেকবুদ্ধি এই মোহকে জয় করতে সক্ষম হয়।
  • শ্রুত ও শ্রোতব্য বিষয়ের প্রতি বৈরাগ্য ('নির্বেদম্'): জাগতিক বা স্বর্গীয় ভোগ-ঐশ্বর্য লাভের জন্য বৈদিক কর্মকাণ্ডে যে সব প্রলোভনময় ফল শ্রুত হয়েছে (পূর্বে শোনা গেছে) অথবা শ্রোতব্য (ভবিষ্যতে শোনার সম্ভাবনা আছে), সেসবের প্রতি সাধকের আর কোনো আকর্ষণ থাকে না। সাধক বুঝতে পারেন যে এসব ক্ষণস্থায়ী বৈষয়িক ফল আত্মকল্যাণের জন্য তুচ্ছ।
  • পরমার্থিক নিশ্চলতার পূর্বশর্ত: সংসার ও শাস্ত্রীয় প্রলোভনের মোহ থেকে মুক্ত হওয়াই হলো মনকে পরমেশ্বরে স্থির করার প্রথম ও প্রধান ধাপ। মোহমুক্ত প্রজ্ঞাই সাধককে অচলা ভক্তিতে প্রতিষ্ঠিত করে।

শ্লোক ৫৩

শ্রুতিবিপ্রতিপন্না তে যদা স্থাস্যতি নিশ্চলা ।
সমাধাবচলা বুদ্ধিস্তদা যোগমবাপ্স্যসি ॥ ৫৩ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: শ্রুতিবিপ্রতিপন্না — তে — যদা
  • দ্বিতীয় চরণ: স্থাস্যতি — নিশ্চলা
  • তৃতীয় চরণ: সমাধৌ — অচলা — বুদ্ধিঃ
  • চতুর্থ চরণ: তদা — যোগম্ — অবাপ্স্যসি

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'শ্রুতিবিপ্রতিপন্না', 'সমাধাবচলা' (সমাধৌ + অচলা), 'বুদ্ধিস্তদা' (বুদ্ধিঃ + তদা), এবং 'যোগমবাপ্স্যসি' (যোগম্ + অবাপ্স্যসি) পদগুলোর সন্ধি ও বিসর্গ ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে শান্ত, গম্ভীর ও নিবিষ্ট লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: যদা = যখন / যে সময়ে; তে = তোমার; শ্রুতিবিপ্রতিপন্না = বেদের নানা প্রকার বিভ্রান্তিকর ও প্রলোভনময় বাক্য দ্বারা আর বিক্ষিপ্ত না হয়ে; স্থাস্যতি = স্থির হয়ে থাকবে; নিশ্চলা = নিশ্চল / বিচলনহীন; সমাধৌ = পরমেশ্বরে / চিতৈকাগ্রে বা সমাধিতে; অচলা = অচলা / অবিচলিত; বুদ্ধিঃ = বুদ্ধি বা প্রজ্ঞা; তদা = তখনই; যোগম্ = পরম তত্ত্বজ্ঞান বা বিশুদ্ধ ভক্তিযোগ; অবাপ্স্যসি = লাভ করবে / প্রাপ্ত হবে

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "বেদের নানা প্রকার বিভ্রান্তিকর ও প্রলোভনময় বাক্যে আর বিচলিত না হয়ে তোমার বুদ্ধি যখন পরমেশ্বরে (বা সমাধিতে) নিশ্চল ও অচলা হয়ে স্থির থাকবে, তখনই তুমি পরম যোগ (বা বিশুদ্ধ তত্ত্বজ্ঞান) লাভ করবে।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • 'শ্রুতিবিপ্রতিপন্না' (শাস্ত্রীয় প্রলোভনে অবিকল থাকা): বৈদিক কর্মকাণ্ডে স্বর্গের নানাবিধ ভৌতিক সুখ-সমৃদ্ধি ও যজ্ঞানুষ্ঠানের বিবরণ থাকে। সাধারণ মানুষের বুদ্ধি এসব সুবাসিত বাক্যে বিমোহিত হয়ে নানা কামনায় ছড়িয়ে পড়ে। সাধক যখন জাগতিক ফলের মোহ ত্যাগ করেন, তখন তাঁর বুদ্ধি শ্রুতির বিবিধ অর্থবাদে আর চঞ্চল হয় না।
  • 'সমাধাবচলা বুদ্ধিঃ' (সমাধিতে অচলা স্থিতি): সকল প্রলোভন ও বৈষয়িক আকর্ষণ অতিক্রম করে বুদ্ধি যখন একমাত্র পরমেশ্বরে বা পরম সত্যে একনিষ্ঠ ও অবিচলভাবে নিমগ্ন হয়, তাকেই বলা হয় প্রকৃত 'সমাধি'।
  • পরম যোগ লাভ ও পরবর্তী প্রসঙ্গের সূচনা: বুদ্ধি নিশ্চল হলে সাধক আত্মজ্ঞান ও ভগবদ্ভক্তির পরম অনুভূতিপ্রাপ্ত হন। এই শ্লোকটি পর্যন্ত শ্রীকৃষ্ণ নিষ্কাম কর্মযোগ ও সমাধির কথা বলার পর, এর ঠিক পরের ৫৪ নম্বর শ্লোক থেকেই অর্জুন এই 'সমাধিস্থ' বা 'স্থিতপ্রজ্ঞ' পুরুষের লক্ষণ সম্পর্কে ভগবানকে প্রশ্ন করা শুরু করবেন।

শ্লোক ৫৪

অর্জুন উবাচ
স্থিতপ্রজ্ঞস্য কা ভাষা সমাধিস্থস্য কেশব ।
স্থিতধীঃ কিং প্রভাষেত কিমাসীত ব্রজেত কিম্ ॥ ৫৪ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: স্থিতপ্রজ্ঞস্য — কা — ভাষা
  • দ্বিতীয় চরণ: সমাধিস্থস্য — কেশব
  • তৃতীয় চরণ: স্থিতধীঃ — কিম্ — প্রভাষেত
  • চতুর্থ চরণ: কিম্ — আসীত — ব্রজেত — কিম্

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'সমাধিস্থস্য' এবং 'কিমাসীত' (কিম্ + আসীত) পদগুলোর সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে স্পষ্ট ও জিজ্ঞাসু লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: কেশব = হে কেশব! (শ্রীকৃষ্ণ); সমাধিস্থস্য = সমাধিতে স্থিত ব্যক্তির; স্থিতপ্রজ্ঞস্য = নিশ্চল প্রজ্ঞাসম্পন্ন / স্থিতপ্রজ্ঞ পুরুষের; কা ভাষা = কী লক্ষণ / কী সংজ্ঞা?; স্থিতধীঃ = স্থিরবুদ্ধি ব্যক্তি; किम् প্রভাষেত = কীভাবে কথা বলেন বা প্রকাশ করেন?; किम् আসীত = কীভাবে অবস্থান বা উপবেশন করেন?; ব্রজেত किम् = কীভাবে বিচরণ বা আচরণ করেন?

বঙ্গানুবাদ: অর্জুন বললেন — "হে কেশব! সমাধিতে অবস্থিত স্থিতপ্রজ্ঞ (স্থিরবুদ্ধি) পুরুষের লক্ষণ বা পরিচয় কী? সেই স্থিতধী ব্যক্তি কীভাবে কথা বলেন, কীভাবে অবস্থান করেন এবং কীভাবে বিচরণ করেন?"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • অর্জুনের বাস্তবমুখী জিজ্ঞাসা: আগের ৫৩ নম্বর শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ বুদ্ধি যখন সমাধিতে স্থির হয়, তখন 'পরম যোগ' বা তত্ত্বজ্ঞান অর্জিত হয় বলে জানিয়েছিলেন। তা শুনে অর্জুনের মনে বাস্তব প্রশ্ন জাগে — যিনি এমন পরম সিদ্ধি পেয়েছেন, তাঁর বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ আচরণ কেমন হয়?
  • চারটি মৌলিক ব্যবহারিক প্রশ্ন: অর্জুন এই শ্লোকে চারটি নির্দিষ্ট প্রশ্ন রেখেছেন —
    • কা ভাষা: স্থিতপ্রজ্ঞ সাধকের প্রধান পরিচয় বা লক্ষণ কী?
    • কিং প্রভাষেত: সুখ-দুঃখ বা লাভ-ক্ষতিতে তাঁর মুখের বাণী ও বাক্য ব্যবহারের ধরণ কেমন হয়?
    • কিমাসীত: বিষয়-সংসারের মাঝে তিনি কীভাবে নিজেকে অবিচলিত ও স্থির রাখেন?
    • ব্রজেত কিম্: তিনি বিষয়-ভোগের সম্মুখীন হয়ে কীভাবে বিচরণ করেন?
  • গীতার আদর্শ মানবদর্শনের সূত্রপাত: এই শ্লোকটির মাধ্যমে গীতার বিখ্যাত 'স্থিতপ্রজ্ঞের লক্ষণ' (৫৪ থেকে ৭২ নম্বর শ্লোক পর্যন্ত) অংশটি শুরু হলো, যা জীবনের পরম আধ্যাত্মিক পূর্ণতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের এক অনুপম দিশারি।

শ্লোক ৫৫

শ্রীভগবানুবাচ
প্রজহাতি যদা কামান্সর্বান্পার্থ মনোগতান্ ।
আত্মন্যেবাত্মনা তুষ্টঃ স্থিতপ্রজ্ঞস্তদোচ্যতে ॥ ৫৫ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: প্রজহাতি — যদা — কামান্
  • দ্বিতীয় চরণ: সর্বান্ — পার্থ — মনোগতান্
  • তৃতীয় চরণ: আত্মনি — এব — আত্মনা — তুষ্টঃ
  • চতুর্থ চরণ: স্থিতপ্রজ্ঞঃ — তদা — উচ্যতে

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'কামান্সর্বান্পার্থ' (কামান্ + সর্বান্ + পার্থ), 'আত্মন্যেবাত্মনা' (আত্মনি + এব + আত্মনা), এবং 'স্থিতপ্রজ্ঞস্তদোচ্যতে' (স্থিতপ্রজ্ঞঃ + তদা + উচ্যতে) পদগুলোর সন্ধি ও বিসর্গ ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে শান্ত, গম্ভীর ও নিবিষ্ট লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: পার্থ = হে পার্থ! (কুন্তীপুত্র অর্জুন); যদা = যখন; মনোগতান্ = মনোগত / মনের মধ্যে উৎপন্ন; সর্বান্ কামান্ = সমস্ত কাম-বাসনাকে; প্রজহাতি = সম্যক্ বা সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করেন; আত্মনি = নিজ অন্তরে / প্রত্যাহৃত মনে; আত্মনা এব = আত্মার আনন্দের দ্বারাই; তুষ্টঃ = পরিতৃপ্ত বা সন্তুষ্ট (আত্মারাম); তদা = তখন; স্থিতপ্রজ্ঞঃ = স্থিতপ্রজ্ঞ (স্থিরবুদ্ধিবিশিষ্ট); উচ্যতে = কথিত বা অভিহিত হন

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "হে পার্থ! মানুষ যখন মনের মধ্যে উৎপন্ন সকল প্রকার কাম-বাসনা সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করেন এবং নিজ অন্তরে আত্মস্বরূপের পরম আনন্দেই সন্তুষ্ট থাকেন (আত্মারাম হন), তখন তাঁকে 'স্থিতপ্রজ্ঞ' বলা হয়ে থাকে।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • স্থিতপ্রজ্ঞের প্রধান লক্ষণ: অর্জুনের "স্থিতপ্রজ্ঞের লক্ষণ কী?" প্রশ্নের উত্তরে শ্রীকৃষ্ণ জানান যে, মনোগত সকল কামনার বিনাশই হলো স্থিতপ্রজ্ঞতার মূল পরিচয়।
  • 'প্রজহাতি সর্বান কামান' (মানসিক বাসনামুক্তি): জাগতিক ভোগপ্রবৃত্তি বা কামনার প্রকৃত জন্মস্থান হলো মানুষের মন। কেবল বাহ্যিক ইন্দ্রিয় সংযম করলেই চলে না; অন্তরের গভীরে থাকা সুক্ষ্ম কামপ্রবৃত্তিকে বৈরাগ্যের মাধ্যমে সম্পূর্ণ উপড়ে ফেলা স্থিতপ্রজ্ঞের লক্ষণ।
  • 'আত্মন্যেবাত্মনা তুষ্টঃ' (আত্মারাম অবস্থা): কামনা বর্জনের ফলে যে শূন্যতার সৃষ্টি হতে পারে, স্থিতপ্রজ্ঞ সাধক তা পূর্ণ করেন আত্মিক অনুভূতির মাধ্যমে। তিনি বাহ্যিক কোনো ভোগদ্রব্য, প্রাপ্তি বা মানুষের ওপর আনন্দের জন্য নির্ভর করেন না; বরং নিজ আত্মাতেই চিরতৃপ্ত ও আনন্দময় থাকেন।

শ্লোক ৫৬

দুঃখেষ্বনুদ্বিগ্নমনাঃ সুখেষু বিগতস্পৃহঃ ।
বীতরাগভয়ক্রোধঃ স্থিতধীর্মুনিরুচ্যতে ॥ ৫৬ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: দুঃখেষু — অনুদ্বিগ্নমনাঃ
  • দ্বিতীয় চরণ: সুখেষু — বিগতস্পৃহঃ
  • তৃতীয় চরণ: বীতরাগভয়ক্রোধঃ
  • চতুর্থ চরণ: স্থিতধীঃ — মুনিঃ — উচ্যতে

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'দুঃখেষ্বনুদ্বিগ্নমনাঃ' (দুঃখেষু + অনুদ্বিগ্নমনাঃ), 'বীতরাগভয়ক্রোধঃ' এবং 'স্থিতধীর্মুনিরুচ্যতে' (স্থিতধীঃ + মুনিঃ + উচ্যতে) পদগুলোর সন্ধি ও বিসর্গ ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে শান্ত, গম্ভীর ও নিবিষ্ট লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: দুঃখেষু = শারীরিক, মানসিক বা সামাজিক ক্লেশ উপস্থিত হলেও; অনুদ্বিগ্নমনাঃ = যাঁর মন উদ্বিগ্ন বা ব্যাকুল হয় না; সুখেষু = লৌকিক সুখ ভোগ উপস্থিত হলেও; বিগতস্পৃহঃ = যাঁর আসক্তি বা ভোগস্পৃহা নেই; বীতরাগভয়ক্রোধঃ = যিনি অনুরাগ/আসক্তি, ভয় ও ক্রোধ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত; স্থিতধীঃ = স্থিতপ্রজ্ঞ বা স্থিরবুদ্ধিসম্পন্ন; মুনিঃ = আত্ম-মননশীল সাধক; উচ্যতে = কথিত বা অভিহিত হন

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "যিনি শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক (বা ত্রিতাপ) দুঃখে অনুদ্বিগ্নচিত্ত, সুখভোগেও স্পৃহাহীন এবং যিনি অনুরাগ (আসক্তি), ভয় ও ক্রোধ থেকে সম্পূর্ণ বিমুক্ত, সেই মননশীল সাধককেই 'স্থিতধী' বা 'স্থিতপ্রজ্ঞ' বলা হয়।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • সুখ ও দুঃখে চিত্তের অনাবিল সমতা: আগের ৫৫ নম্বর শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ সকল মনোগত কামনার বিনাশকে স্থিতপ্রজ্ঞের প্রধান লক্ষণ হিসেবে নির্দেশ করেছিলেন। এই ৫৬ নম্বর শ্লোকে তিনি অর্জুনের দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে জানান যে, স্থিতপ্রজ্ঞ সাধক প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বিচলিত বা উদ্বিগ্ন হন না এবং অনুকূল সুখের উপস্থিতিতেও মাতোয়ারা বা আসক্ত হন না।
  • 'বীতরাগভয়ক্রোধঃ' (রাগ, ভয় ও ক্রোধ থেকে মুক্তি):
    • রাগ (আসক্তি): বস্তুর প্রতি অন্ধ প্রীতি বা মোহাচ্ছন্নতাই হলো 'রাগ'।
    • ভয়: আসক্ত বস্তু হারানোর আশঙ্কা থেকে হৃদয়ে আসে 'ভয়'।
    • ক্রোধ: কামনায় বাধা এলে বা অসন্তোষ তৈরি হলে জন্ম নেয় 'ক্রোধ'।
    স্থিতপ্রজ্ঞ সাধক এই তিন প্রকার মানসিক ক্ষোভ জয় করে পরম আত্মতত্ত্বে স্থায়ী শান্তি লাভ করেন।
  • 'মুনি' শব্দের তাৎপর্য: যিনি কেবল মৌনী থাকেন না, বরং সর্বদা ভগবানের ধ্যান ও পরমাত্মার তত্ত্ব মননে মগ্ন থাকেন, তিনিই প্রকৃত 'মুনি'। সংসারের নানাবিধ ঝঞ্ঝার মধ্যেও তাঁর মন সাগরের মতো গম্ভীর ও স্থির থাকে।

শ্লোক ৫৭

যঃ সর্বত্রানভিস্নেহস্তত্তৎ প্রাপ্য শুভাশুভম্ ।
নাভিনন্দতি ন দ্বেষ্টি তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা ॥ ৫৭ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: যঃ — সর্বত্র — অনভিস্নেহঃ
  • দ্বিতীয় চরণ: তৎ — তৎ — প্রাপ্য — শুভাশুভম্
  • তৃতীয় চরণ: ন — অভিনন্দতি — ন — দ্বেষ্টি
  • চতুর্থ চরণ: তস্য — প্রজ্ঞা — প্রতিষ্ঠিতা

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'সর্বত্রানভিস্নেহস্তত্তৎ' (সর্বত্র + অনভিস্নেহঃ + তৎ + তৎ), এবং 'নাভিনন্দতি' (ন + অভিনন্দতি) পদগুলোর সন্ধি ও বিসর্গ ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে শান্ত ও নিবিষ্ট লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: যঃ = যিনি; সর্বত্র = সমস্ত জড় বিষয়ে / সর্বত্র; অনভিস্নেহঃ = মায়িক বা ঔপাধিক স্নেহশূন্য / আসক্তিহীন; তৎ তৎ = সেই সেই; শুভাশুভম্ = জাগতিক শুভ ও অশুভ (অনুকূল ও প্রতিকূল পরিস্থিতি); প্রাপ্য = প্রাপ্ত হয়ে / লাভ করে; ন অভিনন্দতি = অতি-উচ্ছ্বসিত বা হৃষ্ট হন না; ন দ্বেষ্টি = দ্বেষ বা ঘৃণা প্রকাশ করেন না; তস্য = তারই; প্রজ্ঞা = বুদ্ধি / পরমার্থিক প্রজ্ঞা; প্রতিষ্ঠিতা = সমাধিতে বা পরমেশ্বরে প্রতিষ্ঠিত

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "যিনি সর্বক্ষেত্রে মায়িক স্নেহ বা আসক্তিহীন এবং লৌকিক শুভ কিংবা অশুভ প্রাপ্তিতে আনন্দ প্রকাশ (অভিনন্দন) করেন না বা দ্বেষ প্রকাশ করেন না, তাঁরই প্রজ্ঞা সমাধিতে প্রতিষ্ঠিত (অর্থাৎ তিনিই স্থিতপ্রজ্ঞ)।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • অনভিস্নেহ (জড়ীয় মোহাচ্ছন্নতামুক্তি): স্থিতপ্রজ্ঞ সাধক সংসারের বস্তু, ব্যক্তি বা উপাধির সাথে আত্মিক সম্পর্ক বা অন্ধ আসক্তিতে জড়িয়ে পড়েন না। তিনি জগতের সমস্ত কিছুর সঙ্গে কর্তব্যভিত্তিক আচরণ করলেও অন্তরে অনাসক্ত থাকেন।
  • শুভ ও অশুভে অনাবিল সমতা: জাগতিক জীবনে প্রসন্নতা বা সম্মান পাওয়াকে মানুষ 'শুভ' মনে করে এবং অনাদর, রোগ বা ক্ষতিকে 'অশুভ' মনে করে। সাধারণ মানুষ শুভ প্রাপ্তিতে উল্লসিত হয় এবং অশুভ প্রাপ্তিতে ক্ষুব্ধ বা বিষণ্ণ হয়ে পড়ে। কিন্তু স্থিতপ্রজ্ঞ পুরুষ এই দুই দ্বন্দ্বের কোনোটিতেই বিচলিত হন না।
  • প্রজ্ঞার অবিচল প্রতিষ্ঠা: যাঁর মন অনুকূল-প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সমভাব বজায় রাখতে পারে, তাঁরই বুদ্ধি পরমেশ্বরে স্থির ও প্রতিষ্ঠিত হয়।

শ্লোক ৫৮

যদা সংহরতে চায়ং কূর্মোঽঙ্গানীব সর্বশঃ ।
ইন্দ্রিয়াণীন্দ্রিয়ার্থেভ্যস্তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা ॥ ৫৮ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: যদা — সংহরতে — চ — অয়ম্
  • দ্বিতীয় চরণ: কূর্মঃ — অঙ্গানি — ইব — সর্বশঃ
  • তৃতীয় চরণ: ইন্দ্রিয়াণি — ইন্দ্রিয়ার্থেভ্যঃ
  • চতুর্থ চরণ: তস্য — প্রজ্ঞা — প্রতিষ্ঠিতা

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'চায়ং' (চ + অয়ম্), 'কূর্মোঽঙ্গানীব' (কূর্মঃ + অঙ্গানি + ইব), এবং 'ইন্দ্রিয়াণীন্দ্রিয়ার্থেভ্যস্তস্য' (ইন্দ্রিয়াণি + ইন্দ্রিয়ার্থেভ্যঃ + তস্য) পদগুলোর সন্ধি ও বিসর্গ ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে শান্ত, গম্ভীর ও ধীর লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: যদা = যখন; চ = এবং; অয়ম্ = এই সাধক বা যোগী; কূর্মঃ = কচ্ছপ; অঙ্গানি ইব = (নিজের) অঙ্গসমূহকে যেভাবে (গুটাইয়া নেয়); সর্বশঃ = সর্বতোভাবে / চতুর্দিক থেকে; সংহরতে = সম্যক্ প্রকারে গুটিয়ে নেন বা প্রত্যাহার করেন; ইন্দ্রিয়াণি = চক্ষু, কর্ণাদি ইন্দ্রিয়সমূহকে; ইন্দ্রিয়ার্থেভ্যঃ = রূপ, রস, শব্দ আদি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়সমূহ থেকে; তস্য = তারই; প্রজ্ঞা = প্রজ্ঞা বা বুদ্ধি; প্রতিষ্ঠিতা = সমাধিতে বা পরমেশ্বরে প্রতিষ্ঠিত

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "কচ্ছপ যেমন বিপদ দেখলে বা ইচ্ছানুসারে স্বীয় অঙ্গসমূহকে (হাত, পা, মাথা) নিজ শক্ত খোলসের অভ্যন্তরে গুটিয়ে নেয়, সেইরূপ এই সাধক যখন ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়সমূহ (শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ) থেকে ইন্দ্রিয়গণকে সম্যক্ প্রকারে সংহৃত বা প্রত্যাহার করেন, তখন তাঁর প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিত (অর্থাৎ তিনিই স্থিতপ্রজ্ঞ)।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • কচ্ছপের অনুপম রূপক: প্রাকৃত জগতে কচ্ছপ হলো আত্মসংযম ও আত্মরক্ষার এক নিখুঁত প্রাকৃতিক দৃষ্টান্ত। কচ্ছপ যেমন বাহ্যিক কোনো আশঙ্কা দেখলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার অঙ্গগুলোকে শক্ত খোলসের ভেতরে গুটিয়ে নিয়ে নিরাপদ থাকে, তেমনই স্থিতপ্রজ্ঞ পুরুষও সংসারের প্রলোভন ও বিষয়ের আকর্ষণ দেখলে ইন্দ্রিয়গুলোকে বাহ্যিক জগৎ থেকে অন্তর্মুখী করে নেন।
  • 'ইন্দ্রিয়াণীন্দ্রিয়ার্থেভ্যঃ' (ইন্দ্রিয় প্রত্যাহার বা বৈরাগ্য): সাধারণ মানুষ চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা ও ত্বক — এই পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে বাহ্যিক রূপ, রস, গন্ধ ও শব্দ উপভোগে ধাবিত হয়। কিন্তু স্থিতপ্রজ্ঞ সাধক ইন্দ্রিয়গুলোকে বিষয় থেকে গুটিয়ে নিয়ে আত্মতত্ত্বে স্থির রাখেন।
  • স্বেচ্ছাধীন ও স্বতঃস্ফূর্ত নিয়ন্ত্রণ: কচ্ছপ কোনো জোরজবরদস্তি ছাড়া নিজের ইচ্ছায় যখন খুশি অঙ্গ গুটিয়ে নেয় আবার প্রয়োজন অনুযায়ী বের করে। স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তিও তেমনই বাধ্য হয়ে নয়, বরং নিজস্ব বিবেক, প্রজ্ঞা ও ঈশ্বরানুভূতির মাধ্যমে ইন্দ্রিয়গুলোকে সম্পূর্ণ নিজের বশে রাখতে সক্ষম হন।

শ্লোক ৫৯

বিষয়া বিনিবর্তন্তে নিরাহারস্য দেহিনঃ ।
রসবর্জং রসোঽপ্যস্য পরং দৃষ্ট্বা নিবর্ততে ॥ ৫৯ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: বিষয়াঃ — বিনিবর্তন্তে
  • দ্বিতীয় চরণ: নিরাহারস্য — দেহিনঃ
  • তৃতীয় চরণ: রসবর্জম্ — রসঃ — অপি — অস্য
  • চতুর্থ চরণ: পরম্ — দৃষ্ট্বা — নিবর্ততে

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'রসোঽপ্যস্য' (রসঃ + অপি + অস্য) পদটির সন্ধি ও বিসর্গ ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে শান্ত, গম্ভীর ও নিবিষ্ট লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: নিরাহারস্য = ইন্দ্রিয়ের দ্বারা বিষয়-অগ্রহণকারী (বা উপবাসাদি বর্জনকারী) ব্যক্তির; দেহিনঃ = দেহাভিমানী জীবের; বিষয়াঃ = ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়সকল; বিনিবর্তন্তে = বাহ্যতঃ নিবৃত্ত বা দূর হয়; রসবর্জম্ = আসক্তি বা অন্তরের বিষয়-তৃষ্ণা ব্যতিরেকে (কেবল বাহ্যিক ত্যাগ); রসঃ অপি = অন্তরের বিষয়-পিপাসা বা সূক্ষ্ম আসক্তিও; অস্য = এই স্থিতপ্রজ্ঞের; পরম্ = পরমতত্ত্বকে / পরমাত্মার পরম আনন্দকে; দৃষ্ট্বা = দর্শন বা উপলব্ধি করে; নিবর্ততে = সম্যক্ নিবৃত্ত হয়

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "ইন্দ্রিয়ের দ্বারা বিষয় গ্রহণ না করলে দেহাভিমানী ব্যক্তির বিষয়সকল বাহ্যিকভাবে নিবৃত্ত হয় বটে, কিন্তু অন্তরের বিষয়-তৃষ্ণা (রস) নিবৃত্ত হয় না। কিন্তু স্থিতপ্রজ্ঞ পুরুষ পরমাত্মা বা পরমতত্ত্বের পরম আনন্দ উপলব্ধি করে অন্তরের সেই বিষয়-তৃষ্ণাকেও সম্পূর্ণ নিবৃত্ত করতে সমর্থ হন।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • বাহ্যিক বর্জন বনাম অভ্যন্তরীণ নিবৃত্তি: আগের শ্লোকে কচ্ছপের মতো ইন্দ্রিয় গুটিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। তবে কেবল কৃচ্ছ্রসাধন, উপবাস বা বাহ্যিকভাবে বিষয় ভোগ বন্ধ রাখলেই আসক্তি পুরোপুরি মেটে না। বিষয় দূরে চলে গেলেও অন্তরের গভীরে ভোগবাসনা বা সূক্ষ্ম সংস্কার 'রস' হিসেবে রয়ে যায়।
  • 'পরং দৃষ্ট্বা নিবর্ততে' (উচ্চতর আনন্দের আকর্ষণ): জবরদস্তি করে নিচু স্তরের আসক্তি চিরতরে দূর করা যায় না। কিন্তু সাধক যখন ঈশ্বরানুভূতির পরম আনন্দ, শান্তি ও রূপের স্বাদ পান, তখন পার্থিব তুচ্ছ ভোগ আসক্তি কোনো কষ্ট ছাড়াই স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঝরে পড়ে।
  • স্থিতপ্রজ্ঞের অনাবিল সংযম: স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি কোনো আক্ষেপ বা জোরজবরদস্তির মাধ্যমে বিষয় ত্যাগ করেন না; বরং তিনি পরমাত্মায় এমন তৃপ্ত যে জাগতিক বিষয়বস্তু তাঁর কাছে স্বতঃই অর্থহীন হয়ে যায়।

শ্লোক ৬০

যততো হ্যপি কৌন্তেয় পুরুষস্য বিপশ্চিতঃ ।
ইন্দ্রিয়াণি প্রমাথীনি হরন্তি প্রসভং মনঃ ॥ ৬০ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: যততঃ — হি — অপি — কৌন্তেয়
  • দ্বিতীয় চরণ: পুরুষস্য — বিপশ্চিতঃ
  • তৃতীয় চরণ: ইন্দ্রিয়াণি — প্রমাথীনি
  • চতুর্থ চরণ: হরন্তি — প্রসভম্ — মনঃ

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'যততো হ্যপি' (যততঃ + হি + অপি) এবং 'প্রসভং মনঃ' (প্রসভম্ + মনঃ) পদগুলোর সন্ধি ও বিসর্গ ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে শান্ত, সতর্ক ও ধীর লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: কৌন্তেয় = হে কৌন্তেয়! (কুন্তীপুত্র অর্জুন); হি = যেহেতু; যততঃ = মোক্ষ বা আত্মসংযমের জন্য সচেষ্ট / যত্নশীল ব্যক্তির; বিশ্চিতঃ অপি = বিবেকী বা প্রজ্ঞাবান পুরুষেরও; পুরুষস্য = পুরুষের / সাধকের; প্রমাথীনি = প্রমথনকারী / মনঃক্ষোভকারী ও শক্তিশালী; ইন্দ্রিয়াণি = চক্ষু, কর্ণাদি ইন্দ্রিয়সকল; প্রসভম্ = বলপূর্বক / হঠাৎ; মনঃ = মনকে; হরন্তি = হরণ করে / বিচলিত করে দেয়

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "হে কৌন্তেয়! আত্মসংযম বা মোক্ষের জন্য সচেষ্ট বিবেকী পুরুষের মনকেও বলবান ও প্রমথনকারী (মনঃক্ষোভকর) ইন্দ্রিয়সকল বলপূর্বক হরণ করে (বিচলিত করে তোলে)।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • ইন্দ্রিয়ের প্রমথনকারী শক্তি: আগের ৫৯ নম্বর শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ পরমতত্ত্বের সৌন্দর্য দর্শনে অন্তরের বিষয়-তৃষ্ণা নিবৃত্ত হওয়ার কথা বলেছিলেন। এই ৬০ নম্বর শ্লোকে তিনি ইন্দ্রিয়সমূহের প্রচণ্ড ক্ষোভনকারী শক্তি সম্পর্কে সতর্ক করে দিচ্ছেন। ইন্দ্রিয়গুলো স্বভাবতই বাইরের বিষয়ের দিকে ধাবিত হয় এবং সাধকের চিত্তে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করে।
  • বিবেকী পুরুষেরও পতনের ঝুঁকি: সাধারণ বা অসাবধান মানুষের কথা তো ধরা-ই যায় না, যে ব্যক্তি বিবেকী ('বিশ্চিতঃ') এবং মুক্তি লাভের জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ('যততঃ'), তাঁর মনকেও অসাবধানতার সুযোগে প্রমথী ইন্দ্রিয়সমূহ বলপূর্বক বিষয়াসক্তির দিকে টেনে নিয়ে যেতে পারে।
  • ভক্তি বা ঈশ্বরাশ্রয়ের প্রয়োজনীয়তা: কেবল নিজস্ব আত্মচেষ্টা বা শুষ্ক বিচারবুদ্ধি দিয়ে ইন্দ্রিয়কে সম্পূর্ণ বশে আনা অত্যন্ত কঠিন। তাই এর সমাধান হিসেবে পরবর্তী ৬১ নম্বর শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ ইন্দ্রিয়দমনের একমাত্র সুনিশ্চিত পথ হিসেবে ভগবদ্ভক্তি ও 'মৎপর' (ভগবন্নিষ্ঠ) হওয়ার পরম উপদেশ প্রদান করবেন।

শ্লোক ৬১

তানি সর্বাণি সংযম্য যুক্ত আসীত মৎপরঃ ।
বশে হি যস্যেন্দ্রিয়াণি তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা ॥ ৬১ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: তানি — সর্বাণি — সংযম্য
  • দ্বিতীয় চরণ: যুক্তঃ — আসীত — মৎপরঃ
  • তৃতীয় চরণ: বশে — হি — যস্য — ইন্দ্রিয়াণি
  • চতুর্থ চরণ: তস্য — প্রজ্ঞা — প্রতিষ্ঠিতা

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'যস্যেন্দ্রিয়াণি' (যস্য + ইন্দ্রিয়াণি) এবং 'যুক্ত আসীত' (যুক্তঃ + আসীত) পদগুলোর বিসর্গ ও সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে শান্ত, গম্ভীর ও নিবিষ্ট লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: তানি সর্বাণি = সেই সমস্ত (প্রমথনকারী ইন্দ্রিয়সমূহকে); সংযম্য = সম্পূর্ণরূপে সংযত করে; যুক্তঃ = একাগ্রচিত্ত / সমাহিত হয়ে; আসীত = অবস্থান করা বা উপবিষ্ট হওয়া উচিত; মৎপরঃ = ভগবন্নিষ্ঠ / আমাতে (শ্রীকৃষ্ণে) পরমনোযোগী হয়ে; হি = কারণ / যেহেতু; যস্য = যাঁর; ইন্দ্রিয়াণি = ইন্দ্রিয়সকল; বশে = সম্পূর্ণ বশীভূত বা নিয়ন্ত্রিত; তস্য = তারই; প্রজ্ঞা = প্রজ্ঞা বা বুদ্ধি; প্রতিষ্ঠিতা = সমাধিতে বা পরমেশ্বরে প্রতিষ্ঠিত

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "সাধক সেই সকল (প্রমথনকারী) ইন্দ্রিয়সমূহকে সম্যক্ প্রকারে সংযত করে আমাতে (ভগবানে) পরমনোযোগী ও মৎপর হয়ে সমাহিত চিত্তে অবস্থান করবেন; কারণ যাঁর ইন্দ্রিয়সমূহ সম্পূর্ণ বশীভূত হয়েছে, তাঁরই প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিত (অর্থাৎ তিনিই স্থিতপ্রজ্ঞ)।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • ৬০ নম্বর শ্লোকের সংশয় নিরসন: আগের শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ সতর্ক করেছিলেন যে বলবান ইন্দ্রিয়গুলো বিবেকী সাধকের মনকেও বলপূর্বক হরণ করতে পারে। এই ৬১ নম্বর শ্লোকে তিনি সেই আশঙ্কার চূড়ান্ত সমাধান দিয়েছেন — কেবল নিজের চেষ্টায় ইন্দ্রিয় দমন করা অসম্ভব হলেও, মনকে ঈশ্বরের চরণে সঁপে দিলে ইন্দ্রিয় স্বতঃই বশীভূত হয়ে যায়।
  • 'মৎপরঃ' (ভগবদাশ্রয়ের অপরিসীম শক্তি): কেবল শুষ্ক বৈরাগ্য বা জোরজবরদস্তি দিয়ে ইন্দ্রিয় সংযম স্থায়ী হয় না। ইন্দ্রিয়গুলোকে যখন পরমেশ্বরে বা ভগবদসেবায় নিবেদিত করা হয় (যেমন — কান দিয়ে হরি কথা শ্রবণ, চোখ দিয়ে ভগবদ্ধাম দর্শন), তখন বিষয়াসক্তি অনায়াসে দূর হয়।
  • প্রজ্ঞার অবিচল প্রতিষ্ঠা: যাঁর ইন্দ্রিয়গুলো ঈশ্বরমুখী হয়ে সম্পূর্ণ বশে এসেছে, তাঁর বুদ্ধিই 'স্থিতপ্রজ্ঞতা' লাভ করে এবং তিনি পরম শান্তিতে সমাহিত থাকেন।

শ্লোক ৬২

ধ্যায়তো বিষয়ান পুংসঃ সঙ্গস্তেষূপজায়তে ।
সঙ্গাৎ সংজায়তে কামঃ কামাৎ ক্রোধোঽভিজায়তে ॥ ৬২ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: ধ্যায়তঃ — বিষয়ান্ — পুংসঃ
  • দ্বিতীয় চরণ: সঙ্গঃ — তেষু — উপজায়তে
  • তৃতীয় চরণ: সঙ্গাৎ — সংজায়তে — কামঃ
  • চতুর্থ চরণ: কামাৎ — ক্রোধঃ — অভিজায়তে

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'সঙ্গস্তেষূপজায়তে' (সঙ্গঃ + তেষু + উপজায়তে) এবং 'ক্রোধোঽভিজায়তে' (ক্রোধঃ + অভিজায়তে) পদগুলোর বিসর্গ ও সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে স্পষ্ট ও গম্ভীর লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: বিষয়ান্ = ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়সমূহ (শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ); ধ্যায়তঃ = অনবরত চিন্তা করতে করতে; পুংসঃ = মানুষের বা পুরুষের; তেষু = সেই সকল বিষয়বস্তুতে; সঙ্গঃ = সঙ্গ বা আসক্তি / স্পৃহা; উপজায়তে = উৎপন্ন হয় / জন্মায়; সঙ্গাৎ = সেই আসক্তি থেকে; সংজায়তে = সম্যকভাবে প্রবুদ্ধ হয় বা জন্মায়; কামঃ = কাম বা ভোগাভিলাষ; কামাৎ = কামনায় বাধা প্রাপ্তি থেকে; ক্রোধঃ = ক্রোধ বা রাগ; অভিজায়তে = স্বতঃস্ফূর্তভাবে উপস্থিত হয়

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়সমূহের অনবরত চিন্তা করতে করতে মানুষের সেইসব বিষয়বস্তুতে আসক্তি জন্মায়; আসক্তি থেকে কামনার (ভোগাভিলাষ) জন্ম হয় এবং কামনায় বাধা এলে তা থেকে ক্রোধের উৎপত্তি ঘটে।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • বিষয়-চিন্তাই পতনের প্রথম সূচনাবিন্দু: আগের শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ মনকে ঈশ্বরাশ্রিত বা 'মৎপর' করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পক্ষান্তরে, মানুষ যখন মনকে পরমাত্মায় যুক্ত না করে কেবল বাহ্যিক বিষয়বস্তুর চিন্তায় রত রাখে, তখন অলক্ষ্যে তার ভেতরে বিষয়ের প্রতি আসক্তি (সঙ্গ) দানা বাঁধতে শুরু করে।
  • আসক্তি থেকে কাম ও ক্রোধের উৎপত্তি:
    • আসক্তি (সঙ্গ) → কাম: বিষয়-চিন্তা গভীর হলে আসক্তি জন্মায় এবং সেই আসক্তি থেকেই বস্তুটিকে লাভ করার তীব্র বাসনা বা 'কাম'-এর জন্ম হয়।
    • কাম → ক্রোধ: সেই কামনা পূরণে কোনো বাধা এলে বা কাঙ্ক্ষিত বস্তু না পেলে মানুষের মনে তীব্র অশান্তি ও 'ক্রোধ'-এর সৃষ্টি হয়।
  • মনস্তাত্ত্বিক শৃঙ্খলের প্রথম পর্ব: এই শ্লোকটি মনস্তাত্ত্বিক অধঃপতনের প্রথম ধাপগুলো উন্মোচন করে — বিষয়-ধ্যান ➔ আসক্তি ➔ কাম ➔ ক্রোধ। পরবর্তী শ্লোকে এই ক্রোধের ফলে কীভাবে মানুষের বুদ্ধি ধ্বংস হয়ে সম্পূর্ণ পতন ঘটে, তা প্রকাশিত হবে।

শ্লোক ৬৩

ক্রোধাদ্ভবতি সম্মোহঃ সম্মোহাৎ স্মৃতিবিভ্রমঃ ।
স্মৃতিভ্রংশাদ্ বুদ্ধিনাশো বুদ্ধিনাশাৎ প্রণশ্যতি ॥ ৬৩ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: ক্রোধাৎ — ভবতি — সম্মোহঃ
  • দ্বিতীয় চরণ: সম্মোহাৎ — স্মৃতিবিভ্রমঃ
  • তৃতীয় চরণ: স্মৃতিভ্রংশাৎ — বুদ্ধিনাশঃ
  • চতুর্থ চরণ: বুদ্ধিনাশাৎ — প্রণশ্যতি

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'ক্রোধাদ্ভবতি' (ক্রোধাৎ + ভবতি), 'স্মৃতিভ্রংশাদ্ বুদ্ধিনাশো' (স্মৃতিভ্রংশাৎ + বুদ্ধিনাশঃ), এবং 'বুদ্ধিনাশাৎ প্রণশ্যতি' পদগুলোর সন্ধি ও বিসর্গ ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে স্পষ্ট ও গম্ভীর লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: ক্রোধাৎ = ক্রোধ বা রাগ থেকে; ভবতি = উৎপন্ন বা উপস্থিত হয়; সম্মোহঃ = সম্মোহ (কার্য্যাকার্য-বিবেক বা উচিত-অনুচিতের জ্ঞানের অভাব); সম্মোহাৎ = সেই সম্মোহ বা মোহগ্রস্ততা থেকে; স্মৃতিবিভ্রমঃ = স্মৃতিবিভ্রম (শাস্ত্রোপদিষ্ট উপদেশ বা আত্মস্বার্থের বিস্মৃতি); স্মৃতিভ্রংশাৎ = স্মৃতি ভ্রষ্ট বা বিনষ্ট হওয়ার ফলে; বুদ্ধিনাশঃ = বুদ্ধিনাশ (সৎ ব্যবসায়ের বা বিবেকবুদ্ধির সম্পূর্ণ ধ্বংস); বুদ্ধিনাশাৎ = বুদ্ধি বিনাশের ফলে; প্রণশ্যতি = সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয় (সংসার কূপে পতিত হয়)

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "ক্রোধ থেকে মোহের (কার্য্যাকার্য-বিবেকাভাবের) উৎপত্তি হয়, মোহ থেকে স্মৃতিবিভ্রম ঘটে, স্মৃতিবিভ্রম থেকে বুদ্ধি (বিবেক) বিনষ্ট হয় এবং বুদ্ধিনাশের ফলে মানুষের সম্পূর্ণ পতন বা বিনাশ ঘটে।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • পতনের পূর্ণাঙ্গ ৮টি ধাপ: ৬২ এবং ৬৩ নম্বর শ্লোক দুটি একত্রে মানুষের অধঃপতনের শৃঙ্খল প্রকাশ করে:
    • ১. বিষয়-ধ্যান (বিষয়বস্তুর চিন্তা) ➔
    • ২. সঙ্গ (আসক্তি) ➔
    • ৩. কাম (ভোগাভিলাষ) ➔
    • ৪. ক্রোধ (কামনায় বাধা পেলে প্রাপ্তি) ➔
    • ৫. সম্মোহ: ক্রোধ থেকে জন্ম নেয় মোহ বা উচিত-অনুচিত বিচারের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা।
    • ৬. স্মৃতিবিভ্রম: মোহের ফলে গুরু-শাস্ত্রের উপদেশ ও পরমার্থিক জ্ঞান মানুষ ভুলে যায়।
    • ৭. বুদ্ধিনাশ: স্মৃতি হারিয়ে ফেললে সৎ-অসৎ বিচার করার নিশ্চায়িকা প্রজ্ঞা বা বিবেক বিনষ্ট হয়।
    • ৮. প্রণশ্যতি (সর্বনাশ): বিবেকবুদ্ধি হারিয়ে ফেললে মানুষ আত্মিক ও মানবিক দিক থেকে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়।
  • মনস্তাত্ত্বিক সতর্কবার্তা: আপাতদৃষ্টিতে সামান্য মনে হওয়া বিষয়-চিন্তা কীভাবে অলক্ষ্যে মানুষকে ধাপে ধাপে পরম পতনের দিকে নিয়ে যায়, শ্রীকৃষ্ণ এই মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সাধককে সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক করেছেন।
  • মুক্তির সোপান: এই ধ্বংসাত্মক চক্র থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য এর পরের ৬৪ নম্বর শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ যুক্তিযুক্ত বৈরাগ্য ও আসক্তি-বিদ্বেষহীন চিত্তে ইন্দ্রিয় চালনার মাধ্যমে পরম শান্তি ও চিত্তপ্রাসাদ লাভের উপায় বর্ণনা করবেন।

শ্লোক ৬৪

রাগদ্বেষবিমুক্তৈস্তু বিষয়ানিন্দ্রিয়ৈশ্চরন্ ।
আত্মবশ্যৈর্বিধেয়াত্মা প্রসাদমধিগচ্ছতি ॥ ৬৪ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: রাগদ্বেষবিমুক্তৈঃ — তু
  • দ্বিতীয় চরণ: বিষয়ান্ — ইন্দ্রিয়ৈঃ — চরন্
  • তৃতীয় চরণ: আত্মবশ্যৈঃ — বিধেয়াত্মা
  • চতুর্থ চরণ: প্রসাদম্ — অধিগচ্ছতি

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'রাগদ্বেষবিমুক্তৈস্তু' (রাগদ্বেষবিমুক্তৈঃ + তু), 'বিষয়ানিন্দ্রিয়ৈশ্চরন্' (বিষয়ান্ + ইন্দ্রিয়ৈঃ + চরন্), এবং 'আত্মবশ্যৈর্বিধেয়াত্মা' (আত্মবশ্যৈঃ + বিধেয়াত্মা) পদগুলোর বিসর্গ ও সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে স্পষ্ট ও প্রশান্ত লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: তু = কিন্তু / পক্ষান্তরে; বিধেয়াত্মা = আত্মনিয়ন্ত্রিত বা পরমেশ্বরাধীন মনের অধিকারী সাধক; রাগদ্বেষবিমুক্তৈঃ = আসক্তি (রাগ) ও বিদ্বেষ (দ্বেষ) থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত; আত্মবশ্যৈঃ = সম্পূর্ণ আত্মবশীভূত বা নিয়ন্ত্রিত; ইন্দ্রিয়ৈঃ = ইন্দ্রিয়সমূহের দ্বারা; বিষয়ান্ = জড় বিষয়সমূহ (শব্দ, রূপ, রসাদি); চরন্ = গ্রহণ করেও / আচরণ বা বিচরণ করেও; প্রসাদম্ = প্রসাদ বা নির্মল চিত্তপ্রসন্নতা (পরম প্রশান্তি); অধিগচ্ছতি = লাভ করেন / প্রাপ্ত হন

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "কিন্তু আত্মনিয়ন্ত্রিত সাধক আসক্তি (রাগ) ও বিদ্বেষ (দ্বেষ) মুক্ত এবং সম্পূর্ণ বশীভূত ইন্দ্রিয়সমূহের দ্বারা বিষয় গ্রহণ করেও পরম চিত্তপ্রসন্নতা (বা মানসিক প্রশান্তি) লাভ করেন।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • পতনচক্র থেকে মুক্তির ইতিবাচক পথ: ৬২ ও ৬৩ নম্বর শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ দেখিয়েছিলেন কীভাবে কেবল বিষয়-চিন্তা থেকে মানুষ ধাপে ধাপে কাম, ক্রোধ, মোহ, স্মৃতিবিভ্রম ও বুদ্ধিনাশের মাধ্যমে সর্বনাশের মুখে পতিত হয়। এই ৬৪ নম্বর শ্লোকে তিনি প্রকাশ করলেন যে, জগত সংসার বা বিষয় সম্পূর্ণ বর্জন করাই একমাত্র সমাধান নয়; বরং আসক্তিহীন থেকে সংযত চিত্তে কাজ করাই মুক্তির পরম পথ।
  • 'রাগদ্বেষবিমুক্তৈঃ' (আসক্তি ও বিদ্বেষের ঊর্ধ্বে অবস্থান): মানুষের পতনের মূল কারণ বাহ্যিক বস্তু নয়, বরং বস্তুর প্রতি অন্ধ আকর্ষণের অনুভূতি 'রাগ' (আসক্তি) এবং বস্তুর প্রতি অন্ধ ঘৃণের অনুভূতি 'দ্বেষ' (বিদ্বেষ)। সাধক যখন রাগ ও দ্বেষ উভয় মুক্ত হয়ে কার্য সম্পাদন করেন, তখন কোনো বিষয়ই তাঁর মনের স্থিরতাকে নষ্ট করতে পারে না।
  • 'বিধেয়াত্মা' ও 'প্রসাদমধিগচ্ছতি' (চিত্তপ্রসন্নতা অর্জন): আত্মবশীভূত ইন্দ্রিয়যুক্ত সাধক সংসারে বিচরণ করেও আত্মিক শান্তি ও প্রসন্নতা ('প্রসাদ') লাভ করেন। এই নিরাময় প্রফুল্লতাই সাধককে সর্বপ্রকার বৈষয়িক চঞ্চলতা থেকে মুক্ত রেখে পরমাত্মায় স্থির রাখে।

শ্লোক ৬৫

প্রসাদে সর্বদুঃখানাং হানিরস্যোপজায়তে ।
প্রসন্নচেতসো হ্যাশু বুদ্ধিঃ পর্যবতিষ্ঠতে ॥ ৬৫ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: প্রসাদে — সর্বদুঃখানাম্
  • দ্বিতীয় চরণ: হানিঃ — অস্য — উপজায়তে
  • তৃতীয় চরণ: প্রসন্নচেতসঃ — হি — আশু
  • চতুর্থ চরণ: বুদ্ধিঃ — পর্যবতিষ্ঠতে

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'হানিরস্যোপজায়তে' (হানিঃ + অস্য + উপজায়তে) এবং 'হ্যাশু' (হি + আশু) পদগুলোর সন্ধি ও বিসর্গ ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে শান্ত, প্রশান্ত ও গভীর লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: প্রসাদে = অন্তরের প্রসন্নতা বা চিত্তপ্রশান্তি লাভ হলে; সর্বদুঃখানাম্ = আধ্যাত্মিকাদি সর্বপ্রকার দুঃখের; হানিঃ = বিনাশ / অবসান; অস্য = এই প্রশান্তচিত্ত সাধকের; উপজায়তে = ঘটে / উপস্থিত হয়; প্রসন্নচেতসঃ = নির্মল ও প্রসন্নচিত্ত ব্যক্তির; হি = যেহেতু / কারণ; আশু = অতি শীঘ্রই / অবিলম্বে; বুদ্ধিঃ = প্রজ্ঞা বা নিশ্চায়িকা বুদ্ধি; পর্যবতিষ্ঠতে = সর্বতোভাবে স্থিত বা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "চিত্তপ্রসাদ (মানসিক পরম শান্তি) লাভ হলে সাধকের সর্বপ্রকার দুঃখের অবসান ঘটে; কারণ প্রসন্নচিত্ত পুরুষের বুদ্ধি অতি শীঘ্রই (পরমেশ্বরে বা স্বাভীষ্টে) সর্বতোভাবে স্থির ও প্রতিষ্ঠিত হয়।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • সর্বদুঃখ নিবৃত্তির মূল চাবিকাঠি: আগের শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ বলেছিলেন যে রাগ ও দ্বেষমুক্ত হয়ে সংযত ইন্দ্রিয় দ্বারা বিষয় গ্রহণ করলেও অন্তরে 'চিত্তপ্রসাদ' লাভ হয়। এই ৬৫ নম্বর শ্লোকে তিনি প্রাকট্য করছেন যে, চিত্ত প্রসন্ন হলে মানুষের ত্রিতাপ দুঃখের (আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক ও আধিদৈবিক) চিরতরে অবসান ঘটে।
  • প্রসন্নতার শক্তি ও স্থির প্রজ্ঞা ('বুদ্ধিঃ পর্যবতিষ্ঠতে'): বিক্ষিপ্ত ও অশান্ত মনে কখনো জ্ঞান বা ঈশ্বরভাব প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। কিন্তু মানুষের মন যখন সর্বপ্রকার জাগতিক উদ্বেগ ও আসক্তি থেকে মুক্ত হয়ে প্রসন্ন রূপ ধারণ করে, তখন সেই অচঞ্চল হ্রদের মতো প্রসন্ন চিত্তে পরমাত্মার আলো প্রতিফলিত হয় এবং বুদ্ধি সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।
  • ভক্তির মাধ্যমে পরম প্রসন্নতা: অন্তরের এই নির্মল প্রসন্নতা কেবল শুষ্ক ইন্দ্রিয় দমনে আসে না, বরং পরমেশ্বরে সমাহিত ভক্তিযোগের দ্বারাই সুনিশ্চিতভাবে অর্জিত হয়।

শ্লোক ৬৬

নাস্তি বুদ্ধিরযুক্তস্য ন চায়ুক্তস্য ভাবনা ।
ন চাভাবয়তঃ শান্তিরশান্তস্য কুতঃ সুখম্ ॥ ৬৬ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: নাস্তি — বুদ্ধিঃ — অযুক্তস্য
  • দ্বিতীয় চরণ: ন — চ — অযুক্তস্য — ভাবনা
  • তৃতীয় চরণ: ন — চ — অভাবয়তঃ — শান্তিঃ
  • চতুর্থ চরণ: অশান্তস্য — কুতঃ — সুখম্

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'নাস্তি' (ন + অস্তি), 'বুদ্ধিরযুক্তস্য' (বুদ্ধিঃ + অযুক্তস্য), 'চায়ুক্তস্য' (চ + অযুক্তস্য), এবং 'চাভাবয়তঃ' (চ + অভাবয়তঃ) পদগুলোর বিসর্গ ও সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে স্পষ্ট ও গম্ভীর লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: অযুক্তস্য = অজিতেন্দ্রিয় বা অসংযত চিত্ত ব্যক্তির; বুদ্ধিঃ = পরমার্থিক বা আত্মবিষয়িণী বুদ্ধি / প্রজ্ঞা; ন অস্তি = থাকে না; চ = এবং; ভাবনা = পরমেশ্বরে ধ্যান বা আত্মভাবনা; ন = থাকে না; অভাবয়তঃ = পরমেশ্বরে বা আত্মায় ধ্যানহীন ব্যক্তির; শান্তিঃ = পরম মানসিক শান্তি; অশান্তস্য = শান্তিহীন বা অশান্ত ব্যক্তির; কুতঃ = কোথায়? (অর্থাৎ অসম্ভব); সুখম্ = প্রকৃত পরম সুখ

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "অজিতেন্দ্রিয় বা অসংযত ব্যক্তির প্রজ্ঞা (আত্মবিষয়িণী বুদ্ধি) থাকে না; এবং প্রজ্ঞাহীন ব্যক্তির পরমেশ্বরে ধ্যান বা ভাবনা থাকে না। আর ধ্যানহীন ব্যক্তির পরম শান্তি লাভ হয় না; সুতরাং অশান্ত ব্যক্তির পরম সুখ কোথায় (অর্থাৎ অশান্ত ব্যক্তির পক্ষে প্রকৃত সুখ লাভ একেবারেই অসম্ভব)?"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • প্রশান্তির অভাবের ক্রমিক কারণ: আগের ৬৫ নম্বর শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ বলেছিলেন যে অন্তরে প্রসন্নতা এলে মানুষের সর্বদুঃখের অবসান ঘটে এবং বুদ্ধি স্থির হয়। এই ৬৬ নম্বর শ্লোকে তিনি উল্টো দিক থেকে দেখাচ্ছেন যে, যার চিত্ত অসংযত এবং ইন্দ্রিয় বশীভূত নয়, তার পক্ষে প্রজ্ঞা লাভ করা অসম্ভব।
  • অসংযত মানুষের পতনের চার স্তরের শৃঙ্খল: শ্রীকৃষ্ণ এই শ্লোকে অসংযত জীবনের চারটি পর্যায়ক্রমিক সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করেছেন:
    • ১. অসংযত চিত্ত ➔ বুদ্ধির অভাব: ইন্দ্রিয় সংযম না থাকলে প্রজ্ঞা বা আত্মোপলব্ধির বিচারশক্তি জন্মায় না।
    • ২. বুদ্ধির অভাব ➔ ধ্যান/ভাবনার অভাব: বিচারবুদ্ধি না থাকলে ঈশ্বর বা পরমাত্মাকে ধ্যানের মাধ্যমে অন্তরে ধারণ করা যায় না।
    • ৩. ভাবনার অভাব ➔ শান্তির অভাব: ঈশ্বরভাবনাহীন মনে প্রতিনিয়ত জাগতিক কামনার ঝড় চলে, ফলে সেখানে পরম শান্তির স্থান হয় না।
    • ৪. শান্তির অভাব ➔ সুখের অভাব: যার মন অশান্ত, সে বাহ্যিক বিষয়-সম্পদের মধ্যে থাকলেও কখনো পরম সুখ লাভ করতে পারে না।
  • প্রকৃত সুখের সংজ্ঞা: সাধারণ মানুষ প্রাকৃত বিষয়ভোগকেই 'সুখ' মনে করে, কিন্তু গীতার দর্শনে অন্তরের প্রশান্তি না থাকলে বাহ্যিক সুখ কেবল ক্ষণস্থায়ী বিভ্রম। পরমেশ্বরে মন অর্পণ করে ইন্দ্রিয় জয় করাই প্রকৃত শান্তির একমাত্র ভিত্তি।

শ্লোক ৬৭

ইন্দ্রিয়াণাং হি চরতাং যন্মনোঽনুবিধীয়তে ।
তদস্য হরতি প্রজ্ঞাং বায়ুর্নাবমিবাম্ভসি ॥ ৬৭ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: ইন্দ্রিয়াণাম্ — হি — চরতাম্
  • দ্বিতীয় চরণ: যৎ — মনঃ — অনুবিধীয়তে
  • তৃতীয় চরণ: তৎ — অস্য — হরতি — প্রজ্ঞাম্
  • চতুর্থ চরণ: বায়ুঃ — নাবম্ — ইব — অম্ভসি

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'যন্মনোঽনুবিধীয়তে' (যৎ + মনঃ + অনুবিধীয়তে), 'তদস্য' (তৎ + অস্য), এবং 'বায়ুর্নাবমিবাম্ভসি' (বায়ুঃ + নাবম্ + ইব + অম্ভসি) পদগুলোর বিসর্গ ও সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে শান্ত, গম্ভীর ও সতর্ক লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: হি = যেহেতু / কারণ; চরতাম্ = স্ব স্ব বিষয়ে বিচরণশীল; ইন্দ্রিয়াণাম্ = ইন্দ্রিয়সমূহের মধ্যে; যৎ = যে একটি ইন্দ্রিয়; মনঃ = মনকে; অনুবিধীয়তে = অনুগমন করে / নিজের বশে টানে; তৎ = সেই একটি ইন্দ্রিয়ই; অস্য = এই অজিতেন্দ্রিয় পুরুষের / অসংযত মনের; প্রজ্ঞাম্ = প্রজ্ঞা বা বিবেকবুদ্ধিকে; হরতি = হরণ করে / পথভ্রষ্ট করে; ইব = যেমন / ন্যায়; বায়ুঃ = প্রতিকূল বায়ু বা ঝোড়ো হাওয়া; অম্ভসি = জলরাশি বা সমুদ্রে; নাবম্ = নৌকাকে

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "সমুদ্রে বা জলরাশিতে ভাসমান নৌকাকে যেমন প্রতিকূল বায়ু ইতস্ততঃ বিচলিত করে স্বস্থান থেকে হরণ করে নিয়ে যায়, তেমনই বিষয়ে বিচরণশীল ইন্দ্রিয়সমূহের মধ্যে মন যে একটিমাত্র ইন্দ্রিয়ের অনুগমন করে, সেই একটি ইন্দ্রিয়ই এই অসংযত ব্যক্তির প্রজ্ঞা (বিবেকবুদ্ধি) হরণ করে।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • একটিমাত্র অনিয়ন্ত্রিত ইন্দ্রিয়ের বিপদ: অর্জুনের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, সর্বপ্রকার ইন্দ্রিয় কি একসাথে অসংযত হলেই কেবল মানুষের পতন ঘটে? শ্রীকৃষ্ণ এই শ্লোকে সতর্ক করে দেন যে, আধ্যাত্মিক পতনের জন্য দশটি ইন্দ্রিয়ই উন্মার্গগামী হওয়ার প্রয়োজন নেই; বিষয়ে বিচরণশীল ইন্দ্রিয়গুলোর মধ্যে কেবল একটি ইন্দ্রিয়ও যদি মনকে নিজের দিকে টেনে নিতে পারে, তবে সেই একটিমাত্র ইন্দ্রিয়ই সাধকের অর্জিত জ্ঞান ও বিবেকবুদ্ধি হরণ করতে সক্ষম।
  • নৌকা ও প্রতিকূল বায়ুর গভীর রূপক: জলরাশির বুকে গন্তব্যের দিকে চলা নৌকাকে হঠাৎ আসা তীব্র প্রতিকূল হাওয়া যেমন দিকভ্রষ্ট করে ডুবিয়ে দেয়, তেমনই আত্মোপলব্ধির পথে চলা সাধককে বিষয়াভিুখী একটি চঞ্চল ইন্দ্রিয় সম্পূর্ণ পথভ্রষ্ট করে দেয়।
  • সর্বতোভাবে ইন্দ্রিয় সংযমের আবশ্যকতা: এই মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ স্পষ্ট করলেন কেন কোনো একটি ইন্দ্রিয়কেও ছাড় দেওয়া উচিত নয় এবং সকল ইন্দ্রিয়কে পুরোপুরি বশে আনা কেন জরুরি।

শ্লোক ৬৮

তস্মাদ্ যস্য মহাবাহো নিগৃহীতানি সর্বশঃ ।
ইন্দ্রিয়াণীন্দ্রিয়ার্থেভ্যস্তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা ॥ ৬৮ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: তস্মাৎ — যস্য — মহাবাহো
  • দ্বিতীয় চরণ: নিগৃহীতানি — সর্বশঃ
  • তৃতীয় চরণ: ইন্দ্রিয়াণি — ইন্দ্রিয়ার্থেভ্যঃ
  • চতুর্থ চরণ: তস্য — প্রজ্ঞা — প্রতিষ্ঠিতা

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'তস্মাদ্ যস্য' (তস্মাৎ + যস্য), এবং 'ইন্দ্রিয়াণীন্দ্রিয়ার্থেভ্যস্তস্য' (ইন্দ্রিয়াণি + ইন্দ্রিয়ার্থেভ্যঃ + তস্য) পদগুলোর সন্ধি ও বিসর্গ ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে শান্ত, গম্ভীর ও সুদৃঢ় লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: তস্মাৎ = অতএব / সেই হেতু; মহাবাহো = হে মহাবাহো! (সুদৃঢ় বাহুবিশিষ্ট অর্জুন); যস্য = যাঁর; ইন্দ্রিয়াণি = চক্ষু, কর্ণাদি ইন্দ্রিয়সমূহ; ইন্দ্রিয়ার্থেভ্যঃ = রূপ, রস, শব্দাদি বিষয়বস্তুসমূহ থেকে; সর্বশঃ = সর্বতোভাবে / সর্বপ্রকারে; নিগৃহীতানি = সম্যক্ নিগৃহীত বা সংযত হয়েছে; তস্য = তারই; প্রজ্ঞা = প্রজ্ঞা বা নিশ্চায়িকা বুদ্ধি; প্রতিষ্ঠিতা = সমাধিতে বা পরমেশ্বরে প্রতিষ্ঠিত

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "অতএব হে মহাবাহো! যাঁর ইন্দ্রিয়সকল বিষয়বস্তু (শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ) থেকে সর্বতোভাবে নিগৃহীত (সংযত) হয়েছে, তাঁরই প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিত (অর্থাৎ তিনিই প্রকৃত স্থিতপ্রজ্ঞ)।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • অর্জুনের চার প্রশ্নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত: অর্জুন ৫৪ নম্বর শ্লোকে স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তির লক্ষণ, কথা বলা, অবস্থান ও বিচরণ সম্পর্কে চারটি প্রশ্ন করেছিলেন। ৫৫ থেকে ৬৭ নম্বর শ্লোক পর্যন্ত আলোচনার পর, এই ৬৮ নম্বর শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ সেই প্রসঙ্গের সারসংক্ষেপ টেনে স্পষ্ট করলেন যে, সর্বপ্রকারে ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণই স্থিতপ্রজ্ঞতার চূড়ান্ত মাপকাঠি।
  • 'মহাবাহো' সম্বোধনের গূঢ় তাৎপর্য: শ্রীকৃষ্ণ এখানে অর্জুনকে 'মহাবাহো' (তীব্র শক্তি ও বিশাল বাহুবিশিষ্ট যোদ্ধা) বলে সম্বোধন করেছেন। বাহ্যিক শত্রুকে বিশাল বাহুবল দিয়ে জয় করা গেলেও, ভেতরের রিপু ও ইন্দ্রিয়গুলোকে বশে আনাই হলো সর্বশ্রেষ্ঠ বীরত্ব।
  • 'সর্বশঃ নিগৃহীতানি' (আংশিক নয়, পূর্ণাঙ্গ সংযম): আগের শ্লোকে দেখা গেছে একটিমাত্র অসংযত ইন্দ্রিয়ও সাধকের সর্বনাশের কারণ হতে পারে। তাই এখানে 'সর্বশঃ' শব্দটি ব্যবহার করে শ্রীকৃষ্ণ বুঝিয়েছেন যে ইন্দ্রিয় সংযম হতে হবে আংশিকতামুক্ত ও সর্বাত্মক। যখন যুক্তবৈরাগ্য ও ভগবদভাবনার মাধ্যমে ইন্দ্রিয়সমূহ বিষয় থেকে পুরোপুরি নিগৃহীত হয়, তখনই সাধকের প্রজ্ঞা নিশ্চল ও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।

শ্লোক ৬৯

যা নিশা সর্বভূতানাং তস্যাং জাগর্তি সংযমী ।
যস্যাং জাগ্রতি ভূতানি সা নিশা পশ্যতো মুনেঃ ॥ ৬৯ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: যা — নিশা — সর্বভূতানাম্
  • দ্বিতীয় চরণ: তস্যাম্ — জাগর্তি — সংযমী
  • তৃতীয় চরণ: যস্যাম্ — জাগ্রতি — ভূতানি
  • চতুর্থ চরণ: সা — নিশা — পশ্যতঃ — মুনেঃ

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'সর্বভূতানাং' (সর্বভূতানাম্), 'তস্যাং' (তস্যাম্), 'যস্যাং' (যস্যাম্), এবং 'পশ্যতো মুনেঃ' (পশ্যতঃ + মুনেঃ) পদগুলোর বিসর্গ, অনুস্বার ও সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে শান্ত, গম্ভীর ও সুদৃঢ় লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: সর্বভূতানাম্ = সকল অজ্ঞ বা মায়াবদ্ধ জীবের নিকট; যা = যা (অর্থাৎ আত্মতত্ত্ব বা আধ্যাত্মিক সত্য); নিশা = রাত্রি স্বরূপ (অপ্রকাশিত বা অন্ধকারাচ্ছন্ন); তস্যাম্ = সেই রাত্রিতে (আধ্যাত্মিক চেতনায়); সংযমী = সংযমী / স্থিতপ্রজ্ঞ সাধক; জাগর্তি = জাগ্রত থাকেন (সাক্ষাৎ অনুভব করেন); যস্যাম্ = যে বিষয়ে (জাগতিক বিষয়ভোগ ও মোহে); ভূতানি = সাধারণ জীবসকল; জাগ্রতি = সজাগ থাকে / ব্যস্ত হয়ে ভোগ করে; সা = তা (সেই বিষয়ভোগ); পশ্যতঃ = তত্ত্বদর্শী / পরমার্থদর্শী ব্যক্তির নিকট; মুনেঃ = স্থিতপ্রজ্ঞ মুনির নিকট; নিশা = অন্ধকার রাত্রি স্বরূপ (সম্পূর্ণ তুচ্ছ বা অনাবশ্যক)

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "সকল প্রাণীর কাছে যা রাত্রি স্বরূপ (অর্থাৎ আত্মতত্ত্ব বা আত্মবিষয়িণী বুদ্ধি), সংযমী স্থিতপ্রজ্ঞ পুরুষ সেই রাত্রিতে জাগ্রত থাকেন (অর্থাৎ আত্মানন্দ সাক্ষাৎ অনুভব করেন)। আর যে বিষয়প্রবণ বুদ্ধিতে সাধারণ প্রাকৃত জীবেরা জেগে থাকে (ভোগবিলাসে মগ্ন থাকে), তত্ত্বদর্শী স্থিতপ্রজ্ঞ মুনির পক্ষে তা রাত্রি স্বরূপ (অর্থাৎ তাতে তিনি সম্পূর্ণ উদাসীন থাকেন)।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • দিন ও রাত্রির রূপক: শ্রীকৃষ্ণ এখানে 'দিন' (জাগরণ) ও 'রাত্রি' (নিদ্রা)-কে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন:
    • সাধারণ জীবের দৃষ্টিতে: জাগতিক ধন, মান, বিষয়ভোগ ও দেহসুখই হলো আলো বা 'দিন', তাই তারা এতে মগ্ন ও সজাগ থাকে। কিন্তু আত্মার কল্যাণ, ঈশ্বরচিন্তা ও পরমার্থিক সত্য তাদের কাছে আঁধার বা 'রাত্রি'র মতো অস্পষ্ট।
    • স্থিতপ্রজ্ঞের দৃষ্টিতে: সাধক পরমাত্মার আনন্দ ও আত্মতত্ত্বে পূর্ণ সজাগ ও জাগ্রত থাকেন। আর সাধারণ মানুষ যে বিষয়সুখ ও মোহের পেছনে ছোটে, স্থিতপ্রজ্ঞের কাছে তা তুচ্ছ ও অন্ধকার রাত্রির ন্যায় অর্থহীন।
  • চিদ্বিল্যাস বনাম জড়বিলাস: সাধারণ মানুষ জড়বিলাসী হলেও চিদানন্দহীন; পক্ষান্তরে স্থিতপ্রজ্ঞ সাধক প্রাকৃত জড়ে সম্পূর্ণ উদাসীন হলেও অন্তরে চিদ্বিলাসী ও পরম শান্তিময়।
  • চেতনার পরম পরিবর্তন: প্রজ্ঞার আলো লাভ করলে মানুষের চোখ বাইরের রূপ-রসের মোহ থেকে সরে এসে ভেতরের পরম সত্যের দিকে উন্মীলিত হয় — এটিই ইন্দ্রিয়বিজয়ী সংযমীর প্রধান চেনার উপায়।

শ্লোক ৭০

আপূর্যমাণমচলপ্রতিষ্ঠং সমুদ্রমাপঃ প্রবিশন্তি যদ্বৎ ।
তদ্বৎ কামা যং প্রবিশন্তি সর্বে স শান্তিমাপ্নোতি ন কামকামী ॥ ৭০ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: আপূর্যমাণম্ — অচলপ্রতিষ্ঠম্
  • দ্বিতীয় চরণ: সমুদ্রম্ — আপঃ — প্রবিশন্তি — যদ্বৎ
  • তৃতীয় চরণ: তদ্বৎ — কামাঃ — যম্ — প্রবিশন্তি — সর্বে
  • চতুর্থ চরণ: সঃ — শান্তিম্ — আপ্নোতি — ন — কামকামী

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'আপূর্যমাণমচলপ্রতিষ্ঠং' (আপূর্যমাণম্ + অচলপ্রতিষ্ঠম্), 'সমুদ্রমাপঃ' (সমুদ্রম্ + আপঃ), এবং 'শান্তিমাপ্নোতি' (শান্তিম্ + আপ্নোতি) পদগুলোর অনুস্বার ও সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে শান্ত, গম্ভীর ও ধীর লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: আপূর্যমাণম্ = নানা নদ-নদীর জলদ্বারা সতত পরিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও; অচলপ্রতিষ্ঠম্ = স্বীয় সীমানায় অচল বা অবিচলিতভাবে প্রতিষ্ঠিত; সমুদ্রম্ = মহাসমুদ্রে; আপঃ = অজস্র বর্ষার জলরাশি; প্রবিশন্তি = প্রবিষ্ট হয় (কিন্তু সমুদ্রের কুল অতিক্রম করতে পারে না); যদ্বৎ = যেমন; তদ্বৎ = সেইরূপ / তদ্রূপ; সর্বে কামাঃ = সর্বপ্রকার কাম্য বিষয় বা ভোগসামগ্রী; যম্ = যে স্থিতপ্রজ্ঞ পুরুষে; প্রবিশন্তি = ভোগার্থ উপস্থিত হয় (কিন্তু চিত্তে বিকার বা ক্ষোভ জন্মায় না); সঃ = সেই স্থিতধী সাধকই; শান্তিম্ = পরম অখণ্ড শান্তি; আপ্নোতি = লাভ করেন / প্রাপ্ত হন; ন কামকামী = ভোগ-কামনাশীল বা বিষয়াসক্ত ব্যক্তি (শান্তি লাভ করতে পারে না)

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "নানা নদ-নদীর জলরাশি চারদিক থেকে সতত পরিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও স্বীয় সীমানায় অচলভাবে প্রতিষ্ঠিত মহাসমুদ্রে যেভাবে প্রবেশ করে কিন্তু তাকে ক্ষুব্ধ বা প্লাবিত করতে পারে না; সেইরূপ সর্বপ্রকার কাম্য বিষয় যে স্থিতপ্রজ্ঞ পুরুষের চিত্তে প্রবিষ্ট হয়েও কোনো ক্ষোভের সৃষ্টি করতে পারে না, তিনিই পরম শান্তি লাভ করেন; কিন্তু ভোগ-কামনাশীল বিষয়াসক্ত ব্যক্তি কখনোই সেই শান্তি লাভ করতে পারে না।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • মহাসমুদ্রের গম্ভীর রূপক: বর্ষাকালে হাজারো নদী ফুলে-ফেঁপে বিপুল জলরাশি নিয়ে সাগরে আছড়ে পড়ে, কিন্তু সমুদ্র তার নিজের জায়গা থেকে একটুও বিচলিত হয় না কিংবা বেলাভূমি অতিক্রম করে না। একইভাবে স্থিতপ্রজ্ঞ সাধকের জীবনে নানা রূপ-রস-শব্দাদি কাম্য বিষয় অর্জিত হতে পারে, কিন্তু তাঁর অন্তরের প্রশান্তির গভীরে তা কোনো বিকার বা আলোড়ন তৈরি করতে পারে না।
  • বিষয় গ্রহণ বনাম বিষয়াসক্তি: স্থিতপ্রজ্ঞ পুরুষ বিষয় বর্জন করে কোথাও পালিয়ে যান না; বিষয়সমূহ তাঁর কাছে প্রবিষ্ট হয়, কিন্তু তিনি বিষয়ে আসক্ত হন না। তিনি জানেন যে কোনো প্রাকৃত ভোগ বস্তু আত্মিক আনন্দের তুলনায় অত্যন্ত তুচ্ছ।
  • 'ন কামকামী' (বিষয়াসক্তের শান্তির অসম্ভবতা): যে ব্যক্তি প্রতিনিয়ত নতুন নতুন কামনার পেছনে ছোটে ('কামকামী'), তার মন শুকনো পুকুরের মতো — সামান্য বৃষ্টিতে ভেসে যায় আর সামান্য রোদেই শুকিয়ে যায়। কামনার দাস হয়ে চলা মানুষ কখনো স্থায়ী শান্তি পেতে পারে না; শান্তি কেবল তাঁরই প্রাপ্য যিনি কামনার প্রভু হয়েছেন।

শ্লোক ৭১

বিহায় কামান্ যঃ সর্বান্পুমাংশ্চরতি নিঃস্পৃহঃ ।
নির্মমো নিরহংকারঃ স শান্তিমধিগচ্ছতি ॥ ৭১ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: বিহায় — কামান্ — যঃ — সর্বান্
  • দ্বিতীয় চরণ: পুমান্ — চরতি — নিঃস্পৃহঃ
  • তৃতীয় চরণ: নির্মমঃ — নিরহংকারঃ
  • চতুর্থ চরণ: সঃ — শান্তিম্ — অধিগচ্ছতি

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'কামান্যঃ' (কামান্ + যঃ), 'সর্বান্পুমাংশ্চরতি' (সর্বান্ + পুমান্ + চরতি), এবং 'স শান্তিমধিগচ্ছতি' (সঃ + শান্তিম্ + অধিগচ্ছতি) পদগুলোর বিসর্গ ও সন্ধি ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে শান্ত, গম্ভীর ও প্রশান্ত লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: যঃ = যে; পুমান্ = ব্যক্তি / মানব; সর্বান্ = সমস্ত; কামান্ = ভোগবাসনা বা কামনাসমূহকে; বিহায় = সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করে; নিঃস্পৃহঃ = সকল বিষয়ভোগের স্পৃহাশূন্য / অনাসক্ত হয়ে; নির্মমঃ = দেহ ও দেহ-সম্পর্কিত বিষয়ে 'মমতা' বা আসক্তিহীন; নিরহংকারঃ = 'অহংভাব' বা কর্ত্তৃত্বাভিমানশূন্য; চরতি = বিচরণ করেন; সঃ = তিনিই; শান্তিম্ = পরম পরাশান্তি; অধিগচ্ছতি = লাভ করেন / প্রাপ্ত হন

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "যে ব্যক্তি সকল প্রকার ভোগবাসনা ও কামনা পরিত্যাগ করে স্পৃহাশূন্য, অহংকারহীন এবং 'আমার' এই মমতাভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে সংসারে বিচরণ করেন, তিনিই পরম শান্তি লাভ করেন।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • সর্বকামনা বর্জন ও নিঃস্পৃহতা: মানুষ দুঃখ ও অশান্তি পায় তার মনের অপূর্ণ কামনার কারণে। স্থিতপ্রজ্ঞ সাধক মনোগত সর্বকামনা ও ভোগৈশ্বর্যের মোহ পরিহার করে নিঃস্পৃহ বা আসক্তিহীন হয়ে ওঠেন।
  • 'নির্মমঃ' ও 'নিরহংকারঃ' (অহংতা ও মমতার বিনাশ):
    • নিরহংকার: আমি কর্তা, আমার শক্তি বা আমিই দেহ — এই রূপ প্রাকৃত দেহাত্মবোধ ও অহংকার থেকে মুক্ত হওয়াই হলো নিরহংকারিতা।
    • নির্মম: স্বীয় দেহ, পরিবার, ধন-সম্পদ ও বস্তুর ওপর "এগুলি আমাদের" — এই রূপ স্বত্বাবোধ ও মায়িক আসক্তি ত্যাগ করাই হলো নির্মমতা।
    যখন সাধক সবকিছু পরমেশ্বরে সমর্পিত দেখেন, তখন অহংকার ও মমতা স্বতঃই বিলুপ্ত হয়।
  • পরম শান্তি লাভের ভিত্তি ('স শান্তিমধিগচ্ছতি'): জাগতিক ধন-দৌলত বা ক্ষমতার মধ্যে শান্তি নেই; শান্তি বিরাজ করে অন্তরের অহংকারহীন ও নিঃস্পৃহ ভাবভূমিতে। যিনি সংসারের সমস্ত কর্তব্য পালন করেও অন্তরে আসক্তি ও অহংকারমুক্ত হয়ে বিচরণ করেন, তিনিই প্রকৃত পরশান্তি লাভ করেন।

শ্লোক ৭২

এষা ব্রাহ্মী স্থিতিঃ পার্থ নৈনাং প্রাপ্য বিমুহ্যতি ।
স্থিত্বাস্যামন্তকালেঽপি ব্রহ্মনির্বাণমৃচ্ছতি ॥ ৭২ ॥

১. পাঠের পদ্ধতি ও পদচ্ছেদ (অনুষ্টুপ ছন্দ)

  • প্রথম চরণ: এষা — ব্রাহ্মী — স্থিতিঃ — পার্থ
  • দ্বিতীয় চরণ: ন — এনাম্ — প্রাপ্য — বিমুহ্যতি
  • তৃতীয় চরণ: স্থিত্বা — অস্যাম্ — অন্তকালে — অপি
  • চতুর্থ চরণ: ব্রহ্মনির্বাণম্ — ঋচ্ছতি

উচ্চারণ নির্দেশিকা: 'নৈনাং' (ন + এনাম্), 'স্থিত্বাস্যামন্তকালেঽপি' (স্থিত্বা + অস্যাম্ + অন্তকালে + অপি), এবং 'ব্রহ্মনির্বাণমৃচ্ছতি' (ব্রহ্মনির্বাণম্ + ঋচ্ছতি) পদগুলোর সন্ধি ও বিসর্গ ভেঙে অনুষ্টুপ ছন্দের নিয়মে শান্ত, গম্ভীর ও পরম আনন্দঘন লয়ে পাঠ করতে হয়।

২. প্রতিটি শব্দের অর্থ ও বঙ্গানুবাদ

শব্দার্থ: পার্থ = হে পার্থ! (কুন্তীপুত্র অর্জুন); এষা = এই প্রকার (স্থিতপ্রজ্ঞের অবস্থা); ব্রাহ্মী স্থিতিঃ = ব্রাহ্মী স্থিতি (পরমাত্মায় বা ব্রহ্মে অচল অবস্থান); এনাম্ প্রাপ্য = ইহাকে লাভ করিলে; ন বিমুহ্যতি = আর কখনো মোহগ্রস্ত হয় না; অস্যাম্ = এই ব্রাহ্মী স্থিতিতে; স্থিত্বা = অবস্থিত হয়ে; অন্তকালে অপি = জীবনের শেষ মুহূর্তটিতেও / মৃত্যুকালেও; ব্রহ্মনির্বাণম্ = ব্রহ্মনির্বাণ (জড় মুক্তি ও চিম্ময় ধাম লাভ); ঋচ্ছতি = প্রাপ্ত হন / লাভ করেন

বঙ্গানুবাদ: শ্রীভগবান বললেন — "হে পার্থ! এটিই হলো ব্রাহ্মী স্থিতি (পরমব্রহ্মে অবিচল অবস্থান)। এই স্থিতি লাভ করলে মানুষ আর কখনো সংসার-মোহে পতিত হয় না। জীবনের শেষ মুহূর্তটিতেও (মৃত্যুকালে) এই স্থিতিতে অবস্থান করতে পারলে পরম ব্রহ্মনির্বাণ (জড়ীয় প্রপঞ্চ থেকে মুক্তি ও ভগবদ্দাম) লাভ করা যায়।"

৩. শ্লোকের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য

  • 'ব্রাহ্মী স্থিতি' (পরম আধ্যাত্মিক পূর্ণতা): ৫৫ নম্বর শ্লোক থেকে শুরু হওয়া স্থিতপ্রজ্ঞের বৈশিষ্ট্যের চূড়ান্ত পরিণতি নির্দেশ করা হয়েছে এই শ্লোকে। 'ব্রাহ্মী স্থিতি' হলো চেতনার এমন এক পরমাবস্থা, যেখানে সাধক পরমাত্মার সাথে একাত্ম হয়ে যান। একবার এই দিব্য স্থিতি লাভ করলে মায়িক সংসারের কোনো মোহ বা বিভ্রান্তি তাঁকে আর স্পর্শ করতে পারে না।
  • 'অন্তকালে অপি ব্রহ্মনির্বাণম্' (শেষ মুহূর্তের পরম মুক্তি): যদি কেউ সারা জীবন সাধনা না-ও করতে পারেন, কিন্তু জীবনের অন্তিম মুহূর্তেও (মৃত্যুকালে) সম্পূর্ণ অনাসক্ত হয়ে আত্মায় বা পরমেশ্বরে মন স্থির করে 'ব্রাহ্মী স্থিতি' অর্জন করতে পারেন, তবে তিনিও জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্ত হয়ে পরম শান্তি ও ব্রহ্মনির্বাণ লাভ করেন।
  • দ্বিতীয় অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ: দ্বিতীয় অধ্যায়ে (সাংখ্যযোগ) শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের বিষাদ দূর করতে আত্মার অবিনাশিতা, স্বধর্ম পালন, সমত্ববুদ্ধি ও নিষ্কাম কর্মযোগ, এবং শেষে স্থিতপ্রজ্ঞের লক্ষণ ও ব্রাহ্মী স্থিতির পথ দেখিয়েছেন। এর মাধ্যমে অর্জুনকে মোহমুক্ত হয়ে কর্তব্যযুদ্ধে স্থির হওয়ার পরম দিকনির্দেশনা দেওয়া হলো।

← হোমপেজে ফিরে যান